Friday, March 27, 2020

জীবনে দেখা মহান হৃদয়ের অধিকারী এক মানবতাবাদী মানুষ


।। সুলায়মান আল মাহমুদ।।

বিশ্বায়ন ও চরম আধুনিকায়নের এই যুগে মানবতা আজ ধুকে ধুকে মরছে। সমাজের প্রতিটি স্তরে আজ দ্বন্ধ কলহ। চুরি-ডাকাতি, হানাহানি যেন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতি! সেটা নিয়ে কথা বলাটাও বড় দুর্নীতিতে পরিণত হয়েছে। ঘুষ ছাড়া এই দেশে কোনো কাজ হয় না। এমনকি হুজুরকে বেশী টাকা না দিলে মোনাজাতটি পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত করে দেন। এমন যখন পরিপার্শ্বিক অবস্থা। সেই সময়ে একজন অপরিচিত ভাইয়ের মহানুভবতায় মুগ্ধ হলাম।

৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশের একটি প্রান্তে থেকেও ভাইটি যেন আমার আপনের চেয়েও আপন। বলছিলাম বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলার নশরতপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব তাজুল ইসলাম ভাইয়ের কথা। দেখা হয়নি, কয়েক দিন কথা হয়েছে মাত্র। তবুও ভাইটি আমার যে উপকার করেছেন তার প্রতিদান আমি কি দিবো। সেটা মহান আল্লাহ পাক নিজ হাতেই দিবেন। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই ভাইটিকে নিয়ে দুকলম লিখতে বসলাম। ভালো কাজ প্রচার হলে অন্যরাও এমন কাজে উৎসাহিত হবে। বিবেকের তাড়নায় বিবেকবোধ থেকেই আজকের লেখা। এবার মূল কথায় আসি।

চলতি মার্চ মাসের শুরুর দিকে একটি ব্যক্তিগত সফরে রাজধানী ঢাকা গিয়েছিলাম। সেখানে দুতিনদিন অতিবাহিত করে কাজ শেষে সিলেটে ফিরে আসি। সিলেটে ফেরার দুইদিন পর হঠাৎ মনে পড়লো আমার মানিব্যাগের কথা। অনেক প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র থাকা মানিব্যাগটি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। দোকান এবং বাসা থেকে শুরু করে বেশ কয়েক জায়গায় খোঁজ করেও মানিব্যাগের সন্ধান মিলছিল না। অথচ মানিব্যাগে হাজার তিনেক নগদ টাকা, আমার ভোটার আইটি কার্ড, পত্রিকার আইডি কার্ড, সাইন করা ওয়ান ব্যাংকের দুটি ব্ল্যাংক চেকসহ কিছু জরুরী কাগজ পত্র ছিল। এভাবে দুতিন পেরিয়ে গেলো। কিন্তু মানিব্যাগের সন্ধান পেলাম না। অনেকটা আশা ছেড়ে দিলাম। মনে মনে ভোটার আইডি কার্ড ও পত্রিকার আইডি কার্ডের জন্য জিডি করে পুনরায় তা উত্তোলনের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলাম।

এমন পরিস্থিতে 2019 সালের ২২শে মার্চ একটি অপরিচিত নাম্বার থেকে আমার কর্মস্থল দৈনিক সিলেট বাণী পত্রিকায় ফোন এলো। আমার নাম ধরে জিজ্ঞেস করা হলো আমি সেখানে কাজ করি কি না। অফিস থেকে আমার কথা বলা হলো। ভাইটি অফিস থেকে আমার ব্যক্তিগত নাম্বার সংগ্রহ করে সরাসরি আমাকে ফোন দিলেন। পরিচয় জিজ্ঞেস করে বললেন আমার কোনো জিনিস হারিয়েছে কি না। কিন্তু আমি তাৎক্ষণাত মনে করতে পারছিলাম না। মানিব্যাগটি যে কোথাও হারিয়ে এসেছি এমনটি আমার মনে আসছিলো না। কথার একটি পর্যায়ে ঐ ভাই আমাকে বললেন আমার মানিব্যাগে কি কি ডকুমেন্ট আছে। আমি সব বললাম। কিন্তু চেকের কথা ভুলে গিয়েছিলাম। ভাইটি আমাকে চেকের কথাও জিজ্ঞেস করলেন। আমার মনে পড়ে গেলো। তখন এই ভাই বললেন তার নাম তাজুল ইসলাম। তার গ্রামের বাড়ী বগুড়া জেলার কাহালু উপজেলার ভেতিসোনাই গ্রামে। বর্তমানে বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলার নশরতপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

আমি ভাইটির কথায় যেন বিস্মিত হয়ে গেলাম। আজকের দিনে এমন লোক আছে? আমার মানিব্যাগ হারিয়ে গেলো। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজের সাথে তো হাজার তিনেক টাকাও ছিলো। মানলাম টাকার প্রতি লোভ নাও থাকতে পারে। কিন্তু কারো কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস ফেরত দেয়ার ত একটা ঝামেলা আছে। এস.এ পরিবহনে পাঠাতে হবে। এস.এ পরিবহন বা সুন্দরবন কুরিয়ারের ফি টার কথা না হয় বাদ ই দিলাম। সময় বলেত একটা ব্যাপার সেপার আছে! না। ভাইটি কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই বললেন, ভাই আমি ঢাকার একটি রেষ্টুরেন্টে আপনার মানিব্যাগটি কুড়িয়ে পেয়েছিলাম।

মনে মনে ভাবলাম কোনো খারাপ লোকের হাতে পড়লে হয় তো টাকাগুলা নিয়ে মানিব্যাগটা ফেলে দিবে। এতে করে মানিব্যাগে থাকা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জন্য এর মালিককে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হবে। সেই মনোভাব থেকেই মানিব্যাগটি নিজের ব্যাগে ভরে নিয়ে আসলাম বগুড়াতে। বাড়িতে এসে মানিব্যাগ খুলে পত্রিকার একটি আইডি কার্ডের দিকে দৃষ্টি পড়লো। দেখলাম সেখানে পত্রিকা অফিসের ফোন নাম্বার আছে। অতপর সেখানে ফোন দিয়ে আপনার নাম্বার সংগ্রহ করলাম। ভাই আমি আপনার জিনিসটি আপনার হাতে ফেরত দিতে চাই। আপনি আপনার ঠিকানা ও মোবাইল নাম্বার দেন। আমি কালই পাঠিয়ে দিবো। অতপর (আজ) ২৬ শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসের দিনে আমার মানিব্যাগটি আমার হাতে এসে পৌছেছে। যা যেভাবে ছিল, সব সেই ভাবেই আছে। 
তাজুল ইসলাম 
এই কয় দিনে তাজুল ভাইয়ের সাথে বেশ কয়েকবার আলাপ হলো। উনার পরিবারের খোঁজ খবর নেয়া হলো। ভাইটি যে ইউনিয়ন অফিসে চাকরী করেন সেখানের আশে পাশে এস.এ পরিবহন বা সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস নেই। আমার ডকুমেন্ট পাঠানোর জন্য তাজুল ভাই উপজেলা শহরে আসলেন এবং পাঠালেন। শুধু পাঠিয়ে ক্ষান্ত হন নাই। ঠিকমত পেলাম কি না। বার বার খোজঁ নিচ্ছিলেন। একটা কথা ভাবতেই অবাক লাগে! ভাইটি কত ভালো! একজনের কুড়িয়ে পাওয়া জিনিসটি তার মালিকের হাতে তুলে দিতে ভাইটির প্রানান্তর চেষ্টা বর্তমান সমাজে বিরল।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিতে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শর্ত ছিল সাম্যবাদ, ন্যায় বিচার ও ইনসাফ পূর্ণ সমাজ ব্যবস্থা। মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ থাকবেনা। ক্ষুধা, দারিদ্রতা ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজের মানুষগুলো সোনার মানুষে পরিণত হয়। কিন্তু আজ আমাদের সমাজে এর বিপরীত দৃশ্য চোখে পড়ে। তবুও হাজারো লোকের ভীড়ে একেকজন তাজুল ইসলামের দেখা পাওয়া প্রমাণ করে সমাজ পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। মানবতা এখনো নিঃশেষ হয়ে যায়নি। 

পরিশেষে এই শুভ কামনা করি- ভাল থাকবেন তাজুল ভাই। আপনি বিবেকবোধ থেকে যে কাজটি করলেন আমিও ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে এমন কাজ করবো। আজকের লেখাটি পড়ে হয়তো আরো অনেক ভাই এমন উদ্যোগ নিবেন। এতে সমাজ উপকৃত হবে।

লেখকঃ শিল্পী ও সাংবাদিক।


শেয়ার করুন

Author:

0 coment rios:

You can comment here