Thursday, April 30, 2020

আদর্শ শিক্ষকের নৈতিক গুণাবলী, পর্ব-৪


 
।। আবদুল্লাহ আল মনসুর।।

ক্লাস মনমুগ্ধকর করার টিপস

একটি স্বচ্ছ গ্লাসে যদি পানি রাখা হয়, তাহলে পিপাসা না থাকলেও পান করতে মন চায়। কিন্ত ওয়াশরুমের বদনায় যদি দুধও পরিবেশন করা হয়, তাহলে সেটা কেউ নেয়না। ঠিক তদ্রুপ একজন শিক্ষকের উপস্থাপন শৈলী যদি চমৎকার হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা সহজে তা গ্রহণ করতে পারে। এজন্য শিক্ষকতাকে বলা হয় একটি শিল্প। একটি বিজ্ঞান। একটি কৌশল।

পৃথিবীর যত সম্মানজনক পেশা আছে তার অন্যতম হলো শিক্ষকতা। অনেক ভাল ছাত্র, ভাল শিক্ষক হতে পারেনা। আবার অনেক কম মেধার ছাত্রও ভাল শিক্ষক হতে পারে। একজন শিক্ষকের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও দক্ষতা যেমন দরকার। ঠিক তেমনি কোনো ক্ষেত্রে তার চাইতেও বেশী দরকার হলো উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি ও ইতিবাচক আচরণ। এজন্য মেনে চলতে হয় কিছু নিয়ম নির্দেশনা। অর্জন করতে হয় কিছু গুণাবলী। তাহলেই সম্ভব একজন আদর্শ শিক্ষক হওয়া।

কেন আপনি একজন আদর্শ শিক্ষক হবেন?
আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য?
পার্থিব যশ, খ্যাতি, মোহের জন্য?
নিশ্চয় না। আমরা জানি কেউই পৃথিবীতে স্থায়ী না। কারো জন্য কখন ইন্না লিল্লাহপড়া হয়ে যাবে কেউই জানিনা। সুতরাং দুনিয়াতে থাকাকালীন এমন কিছু করে যেতে হবে যেটার সওয়াব মউতের পরও বহাল থাকে। আর এটি অর্জনের সর্বোত্তম পন্থা হলো শিক্ষকতা। শিক্ষকতা পেশায় আছে একটি আত্মতৃপ্তি যা একজন আদর্শ শিক্ষকই কেবল অনুধাবন করেন ও উপভোগ করেন।

আলোচ্য নিবন্ধে কয়েক পর্বে একজন আদর্শ শিক্ষকের নৈতিক গুণাবলী নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ। আজকের বিষয়: ক্লাস মনমুগ্ধকর করার টিপস, ওয়াবিল্লাহিত তাওফিক।

শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়, বরং ইবাদাতও। তাই শিক্ষকতায় আমাদের আদর্শ হওয়া উচিত পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়াসাল্লাম। তিনি যে পদ্ধতিতে শিক্ষাদান করেছেন, বর্তমান আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান রিসার্চ করলে তারই প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়া যায়।

পূর্ব প্রকাশিত হওয়ার পর------

ক্লাস মনমুগ্ধকর করার কিছু টিপস
অনেক শিক্ষার্থীকে ক্লাসে অমনযোগি দেখা যায়। কারণ একটাই সে পড়াকে উপভোগ করছেনা। ক্লাস মনমুগ্ধকর করার কিছু টিপস নীচে উল্লেখ করা হলো।

১. ক্লাসে বাচ্চাদেরকে দুইভাগ করে প্রতিযোগিতামূলক ক্লাস গ্রহণ। বিভিন্ন গেমস খেলা।

২. প্রতিদিন/ সাপ্তাহিক/ মাসিক সেরা শিক্ষার্থীঘোষণা করা। অথবা উইনার অব দা ডে/ উইক/মানথঘোষণা করা ও পুরুষ্কার প্রদান।

৩. বোর্ডে বিভিন্ন খাবারের ছবি এঁকে অভিনয় করে তাদেরকে খাওয়ানো।

৪.  ক্লাসের শুরুতে অথবা মাঝেমধ্যে শিক্ষার্থীদের বিরক্তিভাব দূর করার জন্য শিক্ষণীয় গল্প বলা। এক্ষেত্রে কাসাসুল কুরআন, কাসাসুল আম্বিয়া, সাহাবায়ে কেরামের জীবনী, পূর্ববর্তী বুযুর্গদের সত্য ও শিক্ষামূলক ঘটনা, ফানি স্টোরি সম্বলিত নির্ভরযোগ্য বই আগ থেকে স্টাডি করে রেডি করে রাখা যেতে পারে।

৫.  মাঝেমধ্যে ছাত্র ছাত্রী সবাইকে দাড় করিয়ে ক্লাস গ্রহণ করা।

৬. শিক্ষার্থী যতই দূর্বল হোক সবসময় তাকে মাশা আল্লাহ’ ‘মারহাবা’ ‘জাযাকাল্লাহ’ ‘ধন্যবাদ  চমৎকার বলেছ’ ‘সুন্দর বলেছইত্যাদি বলে উৎসাহ দেয়া। তথা উৎসাহ মূলক শব্দ বেশি প্রয়োগ করা। কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদেরকে উদ্দেশ্যে করে, ধমক, বোকাঝকা, বিরক্তিমূলক শব্দ, কটুবাক্য, ব্যবহার করা যাবেনা।

৭.  ক্লাসে বা ক্লাসের বাহিরে হাসিখুশি থাকা ও শিক্ষার্থীদের হাসিখুশি রাখা।

৮. পুরুষ্কার হিসেবে চকলেট, বিভিন্ন ফুলের স্টিকার, খাতায় স্টার, বই, খাতা, ইত্যাদি দেয়া যেতে পারে।

৯. প্রতিদিন/ সাপ্তাহিক ক্লাস কেপ্টেন নির্ধারণ করা। এতে শিক্ষার্থীর উৎসাহ বাড়ে। (প্রয়োজনে)

১০. শিক্ষক ড্রাইভার হয়ে গাড়ি চালানোর অভিনয় করবেন ও শিক্ষার্থীরা যাত্রীর অভিনয় করবে।

১১. নিরবতার প্রাকটিস করানো। যেমন শিক্ষক বলবেন, ‘এক মিনিট সবাই হাসো সবাই হাসবে। যখন বলবো স্টপতখন সবাই সাথে সাথে নীরব হয়ে যাবে। আবার বলবো সবাই কাঁদো তখন সবাই কাঁদবে। যখন বলবো স্টপ সাথে সাথে সবাই নীরব হয়ে যাবে। অথবা জোরে এক দুই তিন বলার সাথে সাথে সবাই নীরব হয়ে যাবে।

১২. মুখাভিনয় করে রিমোট দিয়ে সাউন্ড কমানো। (পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে)

১৩. বড় ক্লাস রুম হলে শিক্ষার্থীদের দিয়ে ট্রেন চালানোর অভিনয় করানো।

১৪. শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মত আদর স্নেহ করা। তবে এক্ষেত্রে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে যে আদর কিংবা শাসন করার সময় কোনোভাবেই শিক্ষার্থীর গায়ে হাত দেয়া যাবেনা

১৫. মনে রাখতে হবে শিক্ষার্থীদের দুষ্টামি রোধে কাউন্সিলিংয়ের বিকল্প নেই। তাকে সুন্দরভাবে কনভিন্স করে তার কাছ থেকে যতটুকু উদ্ধার করা যায়, চাপ প্রয়োগ করে তার সিকি ভাগও আদায় করা যায়না।

১৬. শিক্ষার্থীদের তুইনয়। আপনিবা তুমিবলে সম্বোধন করুন। এই মেয়ে, এই ছেলে বলে সম্বোধন  করা যাবে না।

১৭.তাদের নাম আয়ত্ম করার চেষ্টা করতে হবে। নাম ধরে ডাকা। একজন শিক্ষক যখন শিক্ষার্থীর নাম ধরে ডাকেন, তখন শিক্ষার্থী পুলকিত হয়।

১৮. শিক্ষার্থীদের ভেতর আত্ম বিশ্বাস ও আত্ম সম্মানবোধ জাগিয়ে তোলা।

19. শিক্ষার্থীদেরকে ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে স্বপ্ন দেখানো। “কবি বলছেন-
স্বপ্নকে ছেড়ে দাও আকাশ পানে
স্বপ্নকে বড় কর আজকে,
স্বপ্নই মানুষের আসল শক্তি
স্বপ্নই সহজ করে কাজকে।

 20. অনুপ্রেরণাদায়ক কথা বলা। কারণ শিক্ষকের একটু অনুপ্রেরণাদায়ক কথাবার্তা একজন শিক্ষার্থীর জীবন পরিবর্তন করে দিতে পারেআপনি নিজেও হয়ত জানেবেনা।

 কিছু ডায়ালগ মুখস্থ করা যেতে পারে।

৭ এর আগে আদেশ নয়, পরিবেশ
১০ এর আগে শাষণ নয়। আনন্দদায়ক শিক্ষা
বাচ্চাকে ভদ্রতা শেখাতে হলে, আগে নিজে ভদ্র হতে হবে
ঘরকে বিদ্যালয়ের প্রতিচ্ছবি বানান
আগে আপন হোন, তারপর পড়ান
রাগ করা বুযুর্গি না, শয়তানি
রাগ কে তালাক দিন
পঞ্চইন্দ্রীয় যেখানে শেষ, সেখান থেকে কাজ করে আকল।
আর আকল যেখানে শেষ, সেখান থেকে কাজ করে ওহি

আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক হক আদায় করে শিক্ষা ও শিখন কার্যক্রমে নিজেরকে নিয়োজিত রাখার তাওফীক দান করুন। আমীন।

লেখকঃ 
শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
তাকমিল ফিল হাদিস, (মাস্টার্স সমমান)
জামেয়া মাদানিয়া ইসলামিয়া কাজির বাজারসিলেট।
অনার্স (হাদিস)সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা।
(ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কুষ্টিয়া।)
শিক্ষক
শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা পাঠানটুলাসিলেট।
ইনচার্জ
কোরানিক গার্ডেনমিরবক্সটুলাসিলেট।
মেবাইল :  ০১৭৪১৫৮৫০৪০
ইমেইল: abmonsur111@gmail.com


শেয়ার করুন

Author:

0 coment rios:

You can comment here