Saturday, April 11, 2020

বাংলা নববর্ষ বনাম হিজরি নববর্ষঃ প্রেক্ষিত দেশজ সংস্কৃতি


।। ইমদাদুল হক যুবায়ের।।

বাংলা নববর্ষ, পহেলা বৈশাখ, বা নতুন বছর যাকে ইংরেজিতে The Bangla New Year; First day of Bangla Calender বলা হয়। নববর্ষ পৃথিবীর প্রায় সকল জাতিসত্ত্বার ঐতিহ্যের একটি অনিবার্য অংশ। নববর্ষ বাঙালির সহস্র বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, রীতি-নীতি, প্রথা, আচার অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়-
“এলো এলোরে বৈশাখী ঝড়,
ঐ বৈশাখী ঝড় এলো এলো মহীয়ান সুন্দর।
পাংশু মলিন ভীত কাঁপে অম্বর,
চরাচর থরথর
ঘন বন কুন্তলা বসুমতি
সভয়ে করে প্রণতি,
পায়ে গিরি-নির্ঝর
ঝর ঝর।”
অন্যদিকে হিজরি নববর্ষ; ইসলামী বর্ষপঞ্জি বা মুসলিম বর্ষপঞ্জি; যাকে আরবিতে التقويم الهجري‎‎ (আত-তাকউইম আল-হিজরি)  বা হিজরি বর্ষপঞ্জি বলা হয়। যা একটি চন্দ্র নির্ভর বর্ষপঞ্জি। বিভিন্ন মুসলিম দেশ এই বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করে, আর পৃথিবীব্যাপী মুসলমানগণ অনুসরণ করেন ইসলামের পবিত্র দিনসমূহ উদযাপনের জন্য। হযরত ওমর (রা.) তাঁর খিলাফতকালে হিজরতের ১৭তম বর্ষে এ হিজরি সন গণনা শুরু করেন। তাঁর কাছে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় চিঠি আসত। সেখানে মাসের নাম ও তারিখ লেখা হতো। কিন্তু সনের নাম থাকত না। এতে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতো। তখন পরামর্শের ভিত্তিতে একটি সন নির্ধারণ ও গণনার সিদ্ধান্ত হয়। বিভিন্ন উপলক্ষ থেকে সন গণনার মতামত আসলেও শেষ পর্যন্ত হিজরতের ঘটনা থেকে সন গণনার সিদ্ধান্ত হয়।

আলোচ্য নিবন্ধে বাংলা নববর্ষ ও হিজরি নববর্ষ বিষয়ক আলোকপাত:

আমরা দেখি যে, প্রতি বছরই অত্যন্ত ঝাকঝমকভাবে হৈ হুল্লুড় করে পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ পালন করা হয়ে থাকে। যদিও করোনা ভাইরাসের কারণে সরকারের পক্ষ থেকে এবার এ দিবস পালনে শিথীলতার আদেশ জারি করা হয়েছে । তারপরেও বলা হয়েছে ঘরোয়া পরিবেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের যেন ব্যবস্থা করা হয়।

আমাদের দেশে প্রচলিত বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন মূলত ইসলামী হিজরি সনেরই একটি রূপ। ভারতে ইসলামী শাসনামলে হিজরি পঞ্জিকা অনুসারেই সকল কার্যক্রম পরিচালিত হতো। মূল হিজরি পঞ্জিকা চন্দ্র মাসের উপর নির্ভরশীল। চন্দ্র বৎসর সৌর বৎসরর চেয়ে ১১ বা ১২ দিন কম হয়। কারণ সৌর বৎসর ৩৬৫ দিন, আর চন্দ্র বৎসর ৩৫৪ দিন। একারণে চন্দ্র বৎসরে ঋতুগুলো ঠিক থাকে না। আর চাষাবাদ ও এজাতীয় অনেক কাজ ঋতু নির্ভর। এজন্য ভারতের মুঘল সম্রাট আকবরের সময়ে প্রচলিত হিজরি চন্দ্র পঞ্জিকাকে সৌর পঞ্জিকায় রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সম্রাট আকবর তাঁর দরবারের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমির ফতুল্লাহ শিরাজীকে হিজরি চন্দ্র বর্ষপঞ্জিকে সৌর বর্ষপঞ্জিতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব প্রদান করেন। ৯৯২ হিজরি মোতাবেক ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবর এ হিজরি সৌর বর্ষপঞ্জির প্রচলন করেন। তবে তিনি ঊনত্রিশ বছর পূর্বে তার সিংহাসন আরোহনের বছর থেকে এ পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন। এজন্য ৯৬৩ হিজরি সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়। ইতোপূর্বে বঙ্গে প্রচলিত শকাব্দ বা শক বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস ছিল চৈত্র মাস। কিন্তু ৯৬৩ হিজরি সালের মুহাররাম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস, এজন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং পহেলা বৈশাখকে নববর্ষ ধরা হয়। 

তাহলে বাংলা সন মূলত হিজরি সন। রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর হিজরত থেকেই এ পঞ্জিকার শুরু। ১৪১৫ বঙ্গাব্দ অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর হিজরতের পর ১৪১৫ বৎসর। ৯৬২ চন্দ্র বৎসর ও পরবর্তী ৪৫৩ বৎসর সৌর বৎসর। সৌর বৎসর চন্দ্র বৎসরের চেয়ে ১১ বা ১২ দিন বেশি এবং প্রতি ৩০ বৎসরে চন্দ্র বৎসর এক বৎসর বেড়ে যায়। এজন্য ১৪২৮ হিজরি সাল মোতাবেক বাংলা ১৩১৪-13১৫ সাল হয়। 
মুঘল সময় থেকেই পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে কিছু অনুষ্ঠান করা হতো। প্রজারা চৈত্রমাসের শেষ পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করতেন এবং পহেলা বৈশাখে জমিদারগণ প্রজাদের মিষ্টিমুখ করাতেন এবং তখন কিছু আনন্দ উৎসব করা হতো। এছাড়া বাংলার সকল ব্যবসায়ী ও দোকানদার পহেলা বৈশাখে “হালখাতা” করতেন। কিন্তু বর্তমানে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে এমন কিছু কর্মকাণ্ড করা হচ্ছে যা কখনোই পূর্ববর্তী সময়ে বাঙালিরা করেননি এবং যা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে প্রচণ্ডভাবে সাংঘর্ষিক। নববর্ষ উদযাপনের নামে যুবক-যুবতী, কিশোর-কিশোরীদেরকে অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও এদেশের মানুষেরা যা জানত না এখন নববর্ষের নামে তা আমাদের সংস্কৃতির অংশ বানানো হচ্ছে।

বাংলার প্রাচীন মানুষেরা ছিলেন দ্রাবিড় বা হযরত নূহ (আ)-এর বড় ছেলে সামের বংশধর। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সালের দিকে ইয়াফিসের সন্তানদের একটি গ্রুপ আর্য নামে ভারতে আগমন করে। ক্রমান্বয়ে তারা ভারত দখল করে ও আর্য ধর্ম ও কৃষ্টিই পরবর্তীতে হিন্দু ধর্ম নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। ভারতের দ্রাবিড় ও অর্নায ধর্ম ও সভ্যতাকে সর্বদা হাইয্যাক করেছেন আর্যগণ। এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো বাঙালি সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকে হাইয্যাক করা। আর্যগণ বাংলা ভাষা ও বাঙালিদের ঘৃণা করতেন। বেদে ও পুরাণে বাংলা ভাষাকে পক্ষীর ভাষা ও বাঙালিদেরকে দস্যু, দাস ইত্যাদি বলা হয়েছে।

মুসলিম সুলতানগণের আগমনের পরে তারা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। বাঙালি সংস্কৃতি বলতে- বাংলার প্রাচীন লোকজ সংস্কৃতি ও মুসলিম সংস্কৃতির সংমিশ্রণ বুঝানো হতো। কিন্তু ক্রমান্বয়ে আর্যগণ বাঙালিত্ব  বলতে হিন্দুত্ব বলে মনে করেন ও দাবি করেন। ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদীগণ Hindutva অর্থাৎ ভারতীয়ত্ব বা হিন্দুত্ব তথা  হিন্দু ধর্মত্ব বলে দাবি করেন এবং ভারতের সকল ধর্মের মানুষদের হিন্দু ধর্মের কৃষ্টি ও সভ্যতা গ্রহণ বাধ্যতামূলক বলে দাবি করেন। তেমনিভাবে বাংলায় আর্য পণ্ডিতগণ বাঙালিত্ব বলতে হিন্দুত্ব ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ বলতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং বাঙালি সংস্কৃতি বলতে হিন্দু সংস্কৃতি বলে মনে করেন। এজন্যই তারা মুসলমানদের বাঙালি বলে স্বীকার করেন না।
শরৎ চন্দ্রের শ্রীকান্ত গল্পে বাঙালি বলতে শুধু বাঙালি হিন্দুদের বুঝানো হয়েছে এবং মুসলমানদেরকে তাদের বিপরীতে দেখানো হয়েছে। এ মানসিকতা এখনো একইভাবে বিদ্যমান। পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদেরকে বাঙালি পরিচয় দিলে বা জাতিতে বাঙালি লিখলে ঘোর আপত্তি করা হয়। এ মানসিকতার ভিত্তিতেই পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির নামে পৌত্তলিক বা অশ্লীল কৃষ্টি ও সংস্কৃতি আমাদের মধ্যে প্রচার করা হচ্ছে।

বর্তমানে আমাদের জীবনের কোথাও বঙ্গাব্দের কোনো প্রভাব নেই। কাগজে কলমে যাই লেখা হোক, প্রকৃতপক্ষে আমরা নির্ভর করছি খ্রিস্টীয় পঞ্জিকার উপর। যে বাংলা বর্ষপঞ্জি আমরা বছরের ৩৬৪ দিন ভুলে থাকি, সে বর্ষপঞ্জির প্রথম দিনে আমরা সবাই বাঙালি সাজার চেষ্টা করে এ নিয়ে ব্যাপক হৈচৈ করি। আর এ সুযোগে দেশীয় ও বিদেশী বেনিয়াগণ ও আধিপত্যবাদীগণ তাদের ব্যবসা বা আধিপত্য প্রসারের জন্য এ দিনটিকে কেন্দ্র করে বেহায়াপনা, অশ্লীলতা ও অনৈতিকতার প্রচার করে।

পাশ্চাত্য সভ্যতার অনেক ভালো দিক আছে। কর্মস্পৃহা, মানবাধিকার, আইনের শাসন ইত্যাদি অনেক গুণ তাদের মধ্যে বিদ্যমান। পাশাপাশি তাদের কিছু দোষ আছে যা তাদের সভ্যতার ভালো দিকগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ দোষগুলোর অন্যতম হলো অশ্লীলতা। আমরা বাংলাদেশের মানুষের পাশ্চাত্যের কোনো ভালোগুণ আমাদের সমাজে প্রসার করতে পারি নি বা চাই নি। তবে তাদের অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও মাদকতার ধ্বংসাত্মক দিকগুলো আমরা খুব আগ্রহের সাথে গ্রহণ করতে ও প্রসার করতে চাচ্ছি। এজন্য খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডারের শেষ দিনে ও প্রথম দিনে থার্টিফার্স্ট নাইট ও নিউ-ইয়ারস ডে বা নববর্ষ উপলক্ষ্যে আমাদের বেহায়পনার শেষ থাকে না।

পক্ষান্তরে, আমাদের দেশজ সংস্কৃতির অনেক ভালো দিক আছে। সামাজিক শিষ্টাচার, সৌহার্দ্য, জনকল্যাণ, মানবপ্রেম ইত্যাদি সকল মূল্যবোধ আমরা সমাজ থেকে তুলে দিচ্ছি। পক্ষান্তরে দেশীয় সংস্কৃতির নামে অশ্লীলতার প্রসার ঘটানো হচ্ছে। বেপর্দা, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, মাদকতা ও অপরাধ এক সূত্রে বাঁধা। কোনো একটি উপলক্ষ্যে একবার এর মধ্যে নিপতিত হলে সাধারণভাবে কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীরা আর এ থেকে বেরোতে পারে না। বরং ক্রমান্বয়ে আরো বেশি পাপ ও অপরাধের মধ্যে নিপতিত হতে থাকে। কাজেই নিজে এবং নিজের সন্তান-পরিজনকে সকল অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করতে প্রানান্তকর চেষ্টা করতে হবে।
আজ অপসংস্কৃতির ঢেউয়ে যুবক-যুবতীরা অজানা পথে ভেসে চলেছে। এভাবে ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে ধ্বংস লীলার গভীর থেকে গভীরে। এ ছাড়াও বাঙ্গালী সংস্কৃতির নাচ,গান এবং সার্কাস রয়েছে। নাচ, গান মানে নগ্ন, উলঙ্গপনা। নারী চলছে নগ্ন উলঙ্গপনায়। আমরা ভুলে যাই পরকালের কথা। যে  দিন প্রত্যেক মানুষকে নিজ কর্মের জন্য জবাব দিহি করতে হবে।

মুসলমান হলে অন্য ধর্মের উৎসব যেমন পালন করা যাবেনা, অন্য ধর্মাবলম্বীরাও ইসলামের উৎসব পালন করতে হবে এমন বাধ্যবাধকতাও নেই ইসলামে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন-
﴿قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ (1) لَا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ (2) وَلَا أَنْتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ (3) وَلَا أَنَا عَابِدٌ مَا عَبَدْتُمْ (4) وَلَا أَنْتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ (5) لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ (6)
অর্থাৎ, হে নবি! আপনি বলে দেন, হে কাফেররা, আমি (তাদের) ইবাদত করি না যাদের ইবাদত তোমরা কর। না তোমরা (তাঁর) ইবাদত কর যার ইবাদত আমি করি। এবং আমি (কখনোই তাদের) ইবাদত করব না যাদের তোমরা ইবাদত কর। না তোমরা কখনও (তাঁর) ইবাদত করবে যাঁর ইবাদত আমি করি; অতএব তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য আর আমার ধর্ম আমার জন্য।” (সূরা আল কাফিরুন, আয়াত:১-৬)

উৎসবের নামে অশ্লীলতা, এক ধর্মের উৎসব অন্য ধর্মের উপর চাপিয়ে দেয়া কি নুন্যতম মানবতার পরিচয়?

এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
﴿حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ عَنْ الزُّهْرِيِّ قَالَ أَخْبَرَنِي سَالِمُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ كُلُّكُمْ رَاعٍ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
অর্থাৎ, “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্বাধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সহীহ বুখারী, খণ্ড-৮, হাদীস নং ২২৩২)

রাষ্ট্রপ্রধান তার প্রজাদের সম্পর্কে দায়িত্বশীল আর তাকে তাদের পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পুরুষ লোক তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, তাকে তাদের পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন মহিলা তার স্বামীর ঘরের সার্বিক ব্যাপারে দায়িত্বশীলা, তাকে সেটার পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পরিচালক তার মালিকের সম্পদের সংরক্ষক, আর তাকে সেটার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আল্লাহ বলেছেন:
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ
 অর্থাৎ, “মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর।” (আল-কুরআন, সূরা আত তাহরীম, আয়াত:৬)

পহেলা বৈশাখ বা অন্য কোনো উপলক্ষ্যে ছেলেমেয়েদেরকে বেপর্দা ও বেহায়পনার সুযোগ দেয়া অবশ্যই উচিত হবে না। তাদেরকে বুঝাতে হবে এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রনের মধ্যে রাখতে হবে। যেমন একজন অভিভাবক তিনি পরহেজগার বা মসজিদে নামায আদায় করছেন অথচ নিজের ছেলে-মেয়ে পহেলা বৈশাখের নামে বেহায়াভাবে মিছিল বা উৎসব করে বেড়াচ্ছে। এটা মনে রাখতে হবে যে, নিজের ছেলে-মেয়ের পাপের জন্য নিজেরই আমলনামায় গোনাহ জমা হচ্ছে।
মুসলিম সম্প্রদায়ের কোনো উৎসবকে সর্বজনীন করতে গেলে তার মধ্যে অশ্লীলতা, গান-বাজনা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, মাদকতাসহ বিভিন্ন অবৈধ কার্যক্রম ইসলাম কোনোভাবেই অনুমোদন করে না। তবে সব ধর্মের উৎসব ও আনুষ্ঠানিকতার সময় পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহনশীলতা বজায় রাখার ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনা ও গৌরবজনক ঐতিহ্য রয়েছে। সব ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে করতে দেয়া আর সব ধর্মীয় উৎসবকে সবার বলে পরিচয় করিয়ে দেয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
﴿حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ حَدَّثَنَا أَبُو النَّضْرِ حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ ثَابِتٍ حَدَّثَنَا حَسَّانُ بْنُ عَطِيَّةَ عَنْ أَبِي مُنِيبٍ الْجُرَشِيِّ عَنْ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি অন্য জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে সে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে।” (সুনানে আবু দাউদ, খণ্ড-১১, হাদীস নং৩৫১২) অন্য একটি হাদীস যার বর্ণনাকারী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যারা বিধর্মীদের মত উৎসব করবে, কিয়ামত দিবসে তাদের হাশর ঐ লোকদের সাথেই হবে।” (আস-সুনানুল কুবরা, হাদীস নং ১৫৫৬৩)

শুধু তাই নয়। অন্য পাপ আর অশ্লীলতার পার্থক্য হলো, যে ব্যক্তি তার স্ত্রী-সন্তানদের বেহায়াপনা ও অশ্লীলতার সুযোগ দেয় তাকে দাইউস বলা হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) বারবার বলেছেন যে, দাইউস ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।
নিজেকে এবং নিজের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করার পাশাপাশি মুমিনের দায়িত্ব হলো সমাজের মানুষদেরকে সাধ্যমত ন্যায়ের পথে ও অন্যায়ের বর্জনে উদ্বুদ্ধ করা। কাজেই পহেলা বৈশাখ ও অন্য যে কোনো উৎসব উপলক্ষ্যে ছেলে-মেয়েদের অবাধ মেলামেশা ও বেহায়াপনার ক্ষতি, অন্যায় ও পাপের বিষয়ে সবাইকে সাধ্যমত সচেতন করে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে কেউ কথা শুনুক অথবা না শুনুক আমরা আল্লাহর কাছে অফুরন্ত সাওয়াব লাভ করতে সক্ষম হব।

আর যদি আমরা এ বিষয়ে নিজেরা চুপ থাকি এবং অশ্লীলতা বা পাপের আল্লাহর গযব আসে তাহলে নিজেরা যতই সৎ, পরহেজগার হই না কেন সেই গযব থেকে কেউ রক্ষা পাব না। গযব আমাদের স্পর্শই করবেই করবে।

ব্যবসায়িক, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো স্বার্থে অনেক মুসলিম পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে ছেলে-মেয়েদের অবাধ মেলামেশা ও বেহায়াপনার পথ খুলে দেওয়ার জন্য মিছিল, মেলা ইত্যাদির পক্ষে অবস্থান নেন। নিজের দুনিয়া ও আখিরাতের ক্ষতির জন্য এরচেয়ে ভয়ঙ্কর আর কিছুই হতে পারে না। অশ্লীলতা প্রসারের ভয়ঙ্কর পাপ ছাড়াও ভয়ঙ্কর শাস্তির কথা কুরআনে বলা হয়েছে এভাবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
﴿إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آَمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالآَخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لا تَعْلَمُونَ
অর্থাৎ, যারা চায় যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রচার ঘটুক তাদের জন্য পৃথিবীতে এবং আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না।” (আল-কুরআন, সূরা নূর, আয়াত: ১৯)
আপনার স্নেহের সন্তানকে যে বয়সে আপনি রশি ছেড়ে রেখেছেন বর্ষবরণ অনুষ্ঠান পালন করতে, সে বয়সে মুসআব বিন উমাইর (রা.) গিয়েছেন ওহুদ যুদ্ধে শহীদ হতে। আপনার সচেতনতার অভাবে যদি আপনার সন্তান নষ্ট হয় তবে আপনি ব্যর্থ অভিভাবক।

সেদিন আসার আগেই আমরা সচেতন হই, যেদিন আপনার সন্তান আপনার জান্নাতের গতিরোধ করবে। বাংলাদেশের জনগণ মূলত দুটি বড় ধর্মের (মুসলমান ও হিন্দু) অনুসারী। শান্তিপূর্ণভাবে যার যার ধর্মচর্চা এ দেশের ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু বর্তমানে কিছু আদর্শচ্যুত নামধারী মুসলমান হিন্দু ধর্মের কিছু পার্বনকে সার্বজনীন উৎসব হিসাবে প্রচার করতে শুরু করেছে উদ্দেশ্য মূলকভাবে।

এ দেশের একটি গোষ্ঠী বাঙ্গালী হতে গিয়ে হিন্দু রীতির লৌহ নিগঢ়ে নিজেকে জড়িয়ে অসাম্প্রদায়িক হতে চাচ্ছেন। দুর্ভাগ্য হতভাগা মুসলমানদের, যারা নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে জলাঞ্জলি দিয়ে হিন্দু সংস্কৃতির ধারক-বাহক সেজেছে। তাই আদর্শহীনেরা আমাদেরকে তা গিলাতে চেষ্টা করছে। সচেতন মুমিনদের উচিত বর্ষবরণের মতো এমন বেলেল্লাপূর্ণ এবং অর্থ ও সময়ের অপচয়সর্বস্ব অনুষ্ঠান হতে বিরত থাকা এবং সর্বস্তরের মুসলমানদের এই অপসংস্কৃতি থেকে মুক্ত রাখতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। আল্লাহর সন্তুষ্টির অন্বেষায় বিগত বছরের কর্মকান্ড মূল্যায়ন করে আত্ম সমালোচনার মাধ্যমে আগামী দিনের জন্য সুপাথেয় সংগ্রহের জন্য উদ্যমী হওয়া।
এখনই আমাদের সাবধান হতে হবে। এখনই সতর্ক হওয়ার বিকল্প আর কোনো উপায় নেই। আমরা বিভিন্ন দিবস কেন্দ্রীক যে অশ্লীলতা আর বেহায়পনায় নিমজ্জিত হচ্ছি এ জন্য নিজেদের পরিবারে বা নিজেদের জীবনে কখন জানি কোন ধরনের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি নেমে আসবে তা নিজেই বুঝতে পারব না। জীবনে যাই করি না কেন আমাদের নিজেদের কোনো কাজের দ্বারা যেন কখনো অশ্লীলতার প্রসার ঘটে এমন কাজে নিজেদের জড়িত না করি সে দিকে আমাদেরকে সদা সচেষ্ট থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক দান করুন। আমীন।

লেখকঃ প্রাবন্ধিক ও গবেষক
শিক্ষক, জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট।
মোবাইল: 01712374650
ইমেইল: zubairjcpsc@gmail.com
facebook: Imdadul Haque Zubair
Facebook Pageইমদাদুল হক যুবায়ের



শেয়ার করুন

Author:

0 coment rios:

You can comment here