Friday, April 10, 2020

করোনা পরিস্থিতিতে মসজিদে না গিয়ে ঘরে বসে ফরয নামায পড়ার শার‘ঈ বিধান


।। প্রফেসর ডঃ বি এম মফিজুর রহমান আল-আযহারী।।

করোনা পরিস্থিতিতে মসজিদে না গিয়ে ঘরে বসে ফরয নামায পড়ার শারঈ বিধান

الحمد لله، والصلاة  والسلام على رسول الله وعلى آله وصبحه، وبعد
করোনা ভাইরাস মহামারির আকার ধারণ করেছে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এক জনপদ থেকে অন্য জনপদে। দুই শতাধিক রাষ্ট্র এতে আক্রান্ত হয়েছে। থেমে নেই মৃত্যুর মিছিল। আশি হাজারের অধিক মানুষ ইতোমধ্যে প্রাণ হারিয়েছে এই মহামারিতে। 

দশ লক্ষ ছাড়িয়েছে এতে আক্রান্তদের সংখ্যা। বিশ্বজুড়ে মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারা স্থবির হয়ে পড়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে এক দেশে থেকে আরেক দেশ, এক এলাকা থেকে অন্য এলাকা, এক বাড়ী অন্য বাড়ী; বরং এক ঘর থেকে অন্য ঘর। বন্ধ হয়ে গেছে কল-কারখানা, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি অফিস আদালত সবকিছু। কারণ, এ মহামারিটি উচ্চমাত্রায় ছোঁয়াছে রোগ। এর সংক্রমণ ঘটে প্রধানত সামাজিক যোগাযোগের তথা পারস্পরিক সংস্পর্শের মাধ্যমে। তবে ভয়ানক দিকটি হলো, একটি নির্দিষ্ট সময়ের আগে এতে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেও কিছু বুঝতে পারে না। তাই এই সময়ের মধ্যে সে অন্যদেরকেও ছড়িয়ে দিতে পারে এই ভাইরাস। 

আপাত দৃষ্টিতে এতে আক্রান্তদের সংস্পর্শ পরিহার করাই আত্মরক্ষার মোক্ষম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিশেষজ্ঞ মহল থেকে চি‌হ্নিত  করা হয়েছে। 

এই বাস্তবতায় মসজিদে না গিয়ে ঘরে বসে পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায ও জুমুআ আদায়ে ইসলামে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। বরং এটিই অধিকতর বাঞ্জনীয়। ক্ষেত্র বিশেষে ওয়াজিবও বটে। 
বিশ্বনবী (সা.) ও সাহাবীদের  জীবনধারা, শরীয়তের প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা ও ইসলামের মৌলিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করলে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

প্রথমত: প্রতিরক্ষামূলক সতর্কতার নীতি: 

প্রতিরক্ষামূলক সতর্কতা অবলম্বন করা ইসলামের এক সুমহান শিক্ষা। 
পবিত্র কুরআনুল কারীমে আল্লাহ ইরশাদ করেন:
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا خُذُوا حِذْرَكُمْ 
হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের সতর্কতা অবলম্বন কর।-(সূরা নিসা, আয়াত:৭১)। 

এ আয়াতটি যুদ্ধের প্রেক্ষিতে নাযিল হলেও এর অর্থের মধ্যে ব্যাপকতা রয়েছে। যার দাবী হলো, জীবনের সব ক্ষেত্রেই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ, তাফসীর শাস্ত্রের একটি গ্রহণযোগ্য নীতিই হলো: যেই বিশেষ কারণে আয়াত নাযিল হয়, সেই কারণটির মধ্যে অর্থকে সীমাবদ্ধ না করে শব্দের ব্যাপকতাকেই বিবেচনায় নিতে হবে
﴿العبرة بعموم اللفظ، لا بخصوص السبب﴾ 
সূরা আল-বাকারার ১৯৫ আয়াতে বলা হয়েছে:
 ﴿وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ وَأَحْسِنُوا إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ﴾ 
তোমরা নিজেদেরকে নিজেরা ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিওনা (সূরা বাকারা, আয়াত: 195)
এরই আলোকে বিশ্বনবী (সা.) অতিসম্ভাব্য যে কোনো ঝুঁকি, মুসিবত ও সংক্রামক ব্যধি  ইত্যাদি থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতেন এবং অন্যদেরকেও তা গ্রহণ করতে নির্দেশ করতেন। নিম্নোক্ত হাদীসগুলো এ সত্যই প্রমাণ করে: 

ক. রাসূল (সা.) বলেন:
 ﴿وَفِرَّ مِنَ المَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنَ الأَسَدِ﴾
তোমরা (মহামারি আক্রান্ত) কুষ্ঠরোগী থেকে ঐভাবে পালাও যেভাবে সিংহ থেকে (আত্মরক্ষার্থে) পালাও”- (বুখারী)। 
এ কথাও মনে রাখা দরকার যে, মানুষের স্বাভাবিক হাটার গতি ভিন্ন ভিন্ন হলেও নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচার জন্য পালাবার গতি কিন্তু অভিন্ন। তাহলো, সর্বোচ্চ গতিতে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা। পালাও শব্দটির মধ্যে যে অর্থ আছে, তা-ই আজকের পরিভাষায় লগডাউনের রূপ পরিগ্রহ করেছে। অতএব, লগডাউন কোনো নতুন বিষয় নয়। 

খ. রাসূল (সা.) অন্যত্র বলেন:
﴿ لاَ يُورِدَنَّ مُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٍّ﴾
“(মহামারি আক্রান্ত) অসুস্থ লোককে সুস্থ ব্যক্তির কাছে আনা যাবে না(বুখারী/মুসলিম)। এই হাদীসটিতো আলোচ্য বিষয়ে সরাসরি নস। মসজিদে বর্তমান পরিস্থিতিতে অসুস্থ ব্যক্তির থাকার সম্ভাবনা কি উড়িয়ে দেয়া যায়? তাই সতর্কতার দাবী হলো, ঘরে বসেই নামায আদায় করা। 

গ. রাসূল (সা.) দেড় হাজার বছর পূর্বে মহামারীর সংক্রমণ রোধে কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা চালু করে বলেন:
﴿إِذَا سَمِعْتُمْ بِالطَّاعُونِ بِأَرْضٍ فَلاَ تَدْخُلُوهَا، وَإِذَا وَقَعَ بِأَرْضٍ وَأَنْتُمْ بِهَا فَلاَ تَخْرُجُوا مِنْهَا﴾
কোনো এলাকায় তোমরা মহামারীর সংবাদ শ্রবণ করলে সেখানে প্রবেশ করবে না। আর কোনো এলাকায় থাকা অবস্থায় যদি সেথায় মহামারী শুরু হয়, তবে তোমরা সেখান থেকে বের হবে না(বুখারী/মুসলিম)

ঘ. শারীদ বিন সুওয়াইদ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,
﴿كَانَ فِي وَفْدِ ثَقِيفٍ رَجُلٌ مَجْذُومٌ فَأَرْسَلَ إِلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّا قَدْ بَايَعْنَاكَ فَارْجِعْ﴾
ছাক্বীফ গোত্রের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করার জন্য নবী (সা.) এর নিকট বাইআত গ্রহণ করতে এসেছিলে। তখন তাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি ছিল যে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত  ছিল। তখন নবী (সা.)  তাকে তাঁর কাছে না ডেকে বরং লোক পাঠিয়ে  জানিয়ে দিলেন যে, আমি তোমার বাইআত গ্রহণ করে নিয়েছি।  অতএব তুমি ফিরে যাও। (সহীহ মুসলিম হাদীস নং ৪১৩৮)
আজকের করোনার প্রেক্ষিতে আত্মরক্ষার্থে গৃহীত এই সতর্কতার অনিবার্য দাবী হলো: ঘরে বসে নামায পড়া এবং সোশাল যোগাযোগ আপদকালীন সময়ের জন্য বন্ধ রাখা। 

দ্বিতীয়ত:  জীবন রক্ষায় ইসলামের মৌলিক লক্ষ্য বাস্তবায়নে ইবাদাতে সহজনীতি গ্রহণ

এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, ইসলামী শরীয়তের একটি অন্যতম লক্ষ্য হলো, মানব জীবন রক্ষা করা। এ কারণেই ইসলামে ইবাদাতকে অবস্থার প্রেক্ষিতে সহজসাধ্য  করে দেয়া হয়েছে, যাতে মানুষ অতিরিক্ত কষ্ট ও অসহনীয় বোঝার নীচে চাপা না পড়ে। যার ফলশ্রুতিতে তার জীবন ধ্বংসের মুখোমুখি হয়ে যেতে পারে। 

 এ পর্যায়ে দৃষ্টান্ত স্বরূপ যে সব বিধান উল্লেখযোগ্য তা হলো: 
ক. পানি ব্যবহারে ক্ষতি হতে পারে এমন ব্যক্তির জন্য তাইয়্যাম্মুমকে বৈধ করে দেয়া হয়েছে। 

খ. সিয়াম পালনে জীবন নাশ  বা অসহনীয় কষ্ট  হওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন ব্যক্তির জন্য ইফতারের অনুমতি এবং পরবর্তীতে শক্তি থাকলে কাযা করার অন্যথায় দিয়াত দেয়ার বিধান। 

গ. তদ্রুপ অক্ষম ব্যক্তির ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে নামায না পড়ে বসে আদায় কিংবা প্রয়োজনে শুয়ে বা ইশারায় পড়ার অনুমোদন। 

ঘ. সফর অবস্থায় নামায কসরের বিধান। 

এভাবেই প্রমাণিত হয় যে, ইসলামের ভিত্তি হলো সহজতা এবং মানুষের প্রয়োজন বিবেচনা (مراعاة حاجات الناس) নীতির উপর। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
﴿يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ﴾
আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করে দিতে চান। তিনি তোমাদের জন্য কাঠিন্য চান না।” (আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৫) 
অতএব, নিজের উপর অসাধ্য সাধন, দুর্বহ বোঝা ও কাঠিন্য চাপিয়ে নেয়া, ইসলামের এই অকাট্য নীতির পরিপন্থী। আল্লাহ তাআলা বলেন: তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়াময়”। (আন-নিসা, আয়াত: ২৯)

তৃতীয়ত: ক্ষতি প্রতিহতকরণ নীতি

ইসলামী শরীয়তের আরেকটি সর্বজন স্বীকৃত নীতি হলো: অনিষ্ট/কষ্ট অবশ্যই দূর করতে হবে”(الضرر يزال), “কষ্ট সহজতা নিয়ে আসে”(المشقة تجلب التيسير) ইত্যাদি। এগুলো মূলত কুরআন ও সুন্নাহর একাধিক নস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নীতি। যেমন: রাসূলের (সা.) বাণী: لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَনিজের ক্ষতি করা যাবে না অন্যের ক্ষতি করা যাবে না(ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ২৩৩১)
অতএবযে ব্যক্তি এই আশঙ্কা করবে যে, সে নিজে ক্ষতিগ্রস্থ  হবে অথবা অন্যকে ক্ষতিগ্রস্থ  করবে, তার জন্য এই অনুমতি রয়েছে যে, সে জুমুআ ও জামাআতে অনুপস্থিত থাকবে।

চতুর্থত: মসজিদে জামাত ও জুমু  না পড়ার শারঈ ওজর 

 শরীয়তে এমন কিছু ওজরের স্বীকৃতি আছে, যে সব কারণে জামাত ও জুমুআয় না যাওয়ার অনুমতি আছে। যেমন: বৃষ্টি, জীবন, সম্পদ ও আহাল-পরিবারের ব্যাপারে ভয়-ভীতি, অসুস্থতা ইত্যাদি। 

নিম্নোক্ত হাদীসগুলো এ ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য: 

ক. ইমাম মুসলিম হযরত ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন: 
﴿عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّهُ قَالَ لِمُؤَذِّنِهِ فِي يَوْمٍ مَطِيرٍ: " إِذَا قُلْتَ: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ، فَلَا تَقُلْ: حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ، قُلْ: صَلُّوا فِي بُيُوتِكُمْ "، قَالَ: فَكَأَنَّ النَّاسَ اسْتَنْكَرُوا ذَاكَ، فَقَالَ: (أَتَعْجَبُونَ مِنْ ذَا، قَدْ فَعَلَ ذَا مَنْ هُوَ خَيْرٌ مِنِّي، إِنَّ الْجُمُعَةَ عَزْمَةٌ، وَإِنِّي كَرِهْتُ أَنْ أُحْرِجَكُمْ فَتَمْشُوا فِي الطِّينِ وَالدَّحْضِ﴾
হযরত ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন, তিনি একদা বৃষ্টিময় দিনে তার মুআযযিনকে বললেন, আশহাদু আললাইলাহ ইল্লাল্লাহু, আশহাদু আননা মুহামমাদার রাসূলুল্লাহ বলার পর তুমি, হাইয়্যা আলাল ফালাহ বলবে না। বলবে: তোমরা তোমাদের ঘরে নামায পড়ো। তখন যারা সেখানে ছিলো তারা যেন বিষয়টিকে ভালোভাবে নেয়নি। তাই তিনি তাদেরকে বললেন, তোমরা কি হতবাক হয়ে গেলে? আমার চেয়ে যিনি শ্রেষ্ঠ তিনিই এ কাজটি করেছিলেন। অর্থাৎ রাসূল (সা.)। নিশ্চয়ই জুমুআহ একটি আযমাত (অলঙ্ঘনীয় বিষয়) । আর আমি কাদামাটির মধ্য দিয়ে তোমাদেরকে  হেটে আসতে বাধ্য করতে পছন্দ করছি না। (অর্থাৎ বৃষ্টি ও কাঁদাপানির কারণে ঐ আযমাতের মধ্যে রুখসাত এসেছে)। 

খ. হযরত নাফিবলেন,
﴿أذَّن ابن عمر في ليلة باردة بضَجْنَان، ثم قال: صلوا في رحالكم، فأخبرنا أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يأمر مؤذنًا يؤذن، ثم يقول على إثره: (ألا صلوا في الرحال) في الليلة الباردة أو المطيرة في السفر؛ (رواه البخاري ومسلم﴾
“দাজনানা নামক স্থানে বসে ইবনু উমার কোন এক ঠান্ডা রাতে আযান দিলেন। অতঃপর বললেন, তোমরা তোমাদের তাবু/ঘরে বসেই নামায পড়ো। এরপর আমাদেরকে বললেন, রাসূল (সা.) তাঁর মুআযযিনকে আযান দেয়ার পরপরই নির্দেশ দিয়েছিলেন সে যেন বলে, তোমরা তোমাদের তাবুতে/ঘরে বসে নামায পড়ো। এটি ছিলো কোন এক ঠান্ডা রাতে কিংবা সফরে বৃষ্টিময় রাতে”। (বুখারী, মুসলিম)

গ. আমর বিন আওস বলেন
﴿أنبأنا رجلٌ من ثقيف أنه سمع منادي النبي صلى الله عليه وسلم – يعني في ليلة مَطِيرة في السفر – يقول: حي على الصلاة، حي على الفلاح، صلوا في رحالكم؛ (رواه النسائي وأحمد﴾
“সাকিফ গোত্রের এর লোক আমাকে এ মর্মে খবর দিয়েছেন যে, তিনি রাসূলের (রা.) এর মুআযযিনকে সফরাবস্থায় কোনো এক বৃষ্টিস্নাত রাত্রে বলতে শুনেছেন: হাইয়্যা আলাসসলাহ, হাইয়্যা আলাল ফালাহ, সল্লু ফি রিহালিকুম”।-(নাসাই ও আহমাদ) বৃষ্টির কারণে যদি জুমুআ ও জামাতে না যাওয়ার রুখসাত/অনুমতি থাকে, তাহলে অত্যন্ত ভয়াবহ ও কষ্টদায়ক ব্যধির/মহামারীর কারণে সেই রুখসাত থাকাটা অধিকতর সমিচীন। 

গ. হযরত ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা.) বলেছেন: 
‏ ﴿مَنْ سَمِعَ الْمُنَادِيَ فَلَمْ يَمْنَعْهُ مِنَ اتِّبَاعِهِ عُذْرٌ ‏"‏ ‏.‏ قَالُوا وَمَا الْعُذْرُ قَالَ خَوْفٌ أَوْ مَرَضٌ ‏"‏ لَمْ تُقْبَلْ مِنْهُ الصَّلاَةُ الَّتِي صَلَّى ‏"‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو دَاوُدَ رَوَى عَنْ مَغْرَاءٍ أَبُو إِسْحَاقَ
যে ব্যক্তি মুআযযিনের আযান শুনলো এবং তাকে আযানের অনুসরণ করতে কোনো ওযর বাধা দেয়নি। বলা হলো, ওযর কী? তিনি বললেন, ভয় অথবা রোগ, সে যে নামায পড়েছে তা কবুল হবে না ।” 

পঞ্চমত: মানুষকে কষ্ট দেয় এমন দুর্গন্ধময় বস্তু খেয়ে মসজিদে যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা
ইমাম বোখারী হযরত যাবির (রা.) হতে বর্ণনা করেন,
﴿أخرج البخاري عن جابر بن عبد الله رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم قال:من أكل ثوما أو بصلا، فليعتزلنا - أو قال: فليعتزل مسجدنا - وليقعد في بيته﴾
ইমাম বোখারী হযরত যাবির (রা.) হতে বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) বলেছেন: যে ব্যক্তি পিয়াজ বা রসুন খেয়েছে, সে যেন আমাদের মসজিদ পরিহার করে এবং তার ঘরের মধ্যে অবস্থান করে 

এই হাদীসে নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ অন্যকে কষ্ট দেয়া। অথচ পিয়াজ-রসূনের দুর্গন্ধ থেকে মানুষ যে কষ্ট পায় তা নামায শেষ হওয়ার সাথে সাথে দূর হয়ে যায়। সেই পিয়াজ-রসুনের কারণে যদি মসজিদ পরিহার করতে বলা হয়, তাহলে মহামারী নিয়ে মসজিদে যাওয়া কিংবা মহামারির কষ্টে আক্রান্ত হওয়ার প্রকট সম্ভাবনা থাকা সত্বেও মসজিদে যাওয়া কি করে উচিত হতে পারে? তদুপরি বিষয়টি যদি হয় এমন মহামারী সংক্রান্ত, যার কোনো কার্যকর ঔষধ এখনো আবিষ্কৃত হয়নি, যা পারস্পরিক সংস্পর্শের মাধ্যমে অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। তাই বোঝা গেল, এমতাবস্থায় জুমুআ ও জামাতে অনুপস্থিত থাকায় মুসলিমগণ মাযুর হিসেবে গণ্য হবেন। 
ষষ্ঠত: মহামারীর সময় বাড়ীতে/ঘরে অবস্থানের ব্যাপারে হাদীসের দিক নির্দেশনা
হাদীসে এসছে-
﴿ليس رجل يقع الطاعون، فيمكث في بيته صابرا محتسبا، يعلم أنه لا يصيبه إلا ما كتب الله له ، إلا كان له مثل أجر الشهيد 
যে ব্যক্তি মহামারীর সময় ধৈর্য্য ও সাওয়াবের প্রত্যাশায় ঘরের মধ্যে অবস্থান করবে এবং এই বিশ্বাস ধারণ করবে যে, আল্লাহর তার জন্য যা সিদ্ধান্ত রেখেছেন, তার বাহিরে কিছুই হবে না, তাকে শহীদের মত সাওয়াব দেয়া হবে(সুনানে আহমাদ) অন্য বর্ণনায় بيته (বাড়ীর) স্থানে بلده (শহর/এলাকা) উল্লেখ করা হয়েছে।

সপ্তমত:  মহামারির আগুন নেভাতে সাহাবীদের আমল 

হযরত উমারে যুগে শামে যে আমওয়াস নামক মহামারী হয়েছিলো, তাতে পচিশ/ত্রিশ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন। যাদের মধ্যে ছিলেন, শামের গভর্ণন হযরত আবু উবাইদাহ বিন যাররাহ, হযর মুআয বিন যাবাল, হযরত ইয়াজিদ বিন আবি সুফিয়ান, সুহাইল বিন আমরের মত বড় বড় সাহাবী (রা.)। হযরত আবু উবাইদার পর হযরত আমর বিন আল-আস (রা.) সিরিয়ার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং জনগণকে বলেন: 
﴿أيُّها الناس إِنَّ هذا الوجع إِذا وقع إِنما يشتعل اشتعال النَّار، فتجنَّبوا منه في الجبال، فخرج، وخرج النّاس، فتفرقوا حتّى رفعه الله عنهم، فبلغ عمر ما فعله عمرو، فما كرهه﴾
হে লাক সকল! এই মুসিবত (মহামারী) যখন কোনো জনপদে দেখা দেয়, তখন তা আগুনের মত জ্বলে ওঠে। এই আগুনের হাত থেকে বাঁচার জন্য  তোমরা পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নাও। (অর্থাৎ আগুন যখন ইন্ধন পাবে না, তখন এমনিতেই নিভে যাবে)। তখন লোকেরা বিচ্ছিন্নভাবে পাহাড়ে চলে গেল এবং আল্লাহ তাআলা মহামারী তুলে নিলেন। খলীফা উমরের কাছে এ খবর পৌঁছালে তিনি বিষয়টি অপছন্দ করেন নি। বরং কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, খলীফা উমরই আমর (রা.) কে ঐ মর্মে নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। আগুন ও লাকড়ির সম্পর্ক যেমন মহামারিকালে পারস্পরিক সংস্পর্শ সে রকমই একটি বিষয়। তাই এ অবস্থার পরিহার করতে হবে। জুমুআ ও জামাতে না যাওয়া এই পর্যায়েরই একটি উদ্যোগ। 

আমাদের করণীয়: 

১. পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ঘরের মধ্যে বসে পরিবারের লোকদের নিয়ে জামাতে নামায আদায় করা। এতে নারী-পুরুষ সবাই অংশ নিতে পারবে। বিনোদনের নামে বহুলাংশে অশ্লীলতার ছোবলে আক্রান্ত পরিবারগুলো অন্তত এই সুযোগে আল্লাহর সাথে নতুন করে সংযুক্ত হওয়ার একটা সুবর্ণ সুযোগ পাবে। 

২. মসজিদগুলোতে অবশ্যই আযান দিতে হবে। মুআযযিনগণ ইচ্ছা করলে প্রত্যেক আযানের সাথে এ  বাক্যটি সংযোজন করতে পারে صلوا في بيوتكم  হাইয়্যা আলাল ফালাহর পরিবর্তে অথবা আযানের শেষে। 

৩. আশা করা যাচ্ছে, ঘরে বসে পড়লেও আমরা জামাতের সাওয়াব পাবো إن شاء الله কারণ, আমরা এই মূহুর্তে মাযুর (ওজরসম্পন্ন)। তাছাড়া, জামাতের সর্বনিম্ন সংখ্যা দুজন। যেমনটি হাদীসে আছে। কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়
﴿أَنَّهُ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى رَجُلا يُصَلِّي وَحْدَهُ فَقَالَ : أَلَا رَجُل يَتَصَدَّق عَلَى هَذَا فَيُصَلِّيَ مَعَهُ ؟ فَقَامَ رَجُل فَصَلَّى مَعَهُ , فَقَالَ : هَذَانِ جَمَاعَة﴾
একদিন রাসূল (সা.) এক ব্যক্তিকে নামায পড়তে দেখলেন একা একা। তখন বললেন, কেউ কি আছে এই লোকটির সাথে নামায পড়ার মাধ্যমে তাকে সাদাকাহ দিবে অর্থাৎ তার একটা উপকার করবে? এক ব্যক্তি তখন দাঁড়ালেন এবং তার সাথে নামায পড়লেন। রাসূল (সা.) তখন বললেন: এই দুই জন একটি জামাত। আবু মুসা আশআরী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল (সা.) বলেন: 
﴿والدليل عليه: ما روى أبو موسى الأشعري: أن النبي - صَلَّى اللَّهُ وَسَلَّمَ - قال:الاثنان فما فوقهما جماعة﴾
দুই বা ততোধিক হলো জামাত শায়খ আবু হামিদ গাজালী এই জন্যেই বলেছেন,
﴿قال الشيخ أبو حامد: والذي لا خلاف فيه على المذهب، ولا بين أحد - إن شاء الله - أن الاثنين إذا أمَّ أحدهما الآخر جماعةٌ داخلة تحت قوله - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ -: صلاة الجماعة تفضل صلاة الفرد بسبع وعشرين درجة﴾
 এ ব্যাপারে মযহাবে কোনো মতভিন্নতা নেই যে, দুজন যদি এক সাথে নামায পড়ে, একজন ইমাম অন্যজন মুক্তাদি হিসেবে, তাতে  জামাতের ২৭ গুণ সাওয়াব পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ। 

তাছাড়া, যে ব্যক্তি সব সময় যে ভালো কাজটি করে সে যদি অসুস্থতা বা ওযরের কারণে সে কাজটি করতে সাময়িকভাবে অক্ষম হয়, তবুও তাকে সেই কাজের সাওয়াব দেয়া হয়। রাসূল (সা.) বলেন:
﴿عن أبي موسى - رضي الله عنهما - قال: قال رسول الله - صلى الله عليه وسلم -: ((إذا مرض العبد أو سافر كتب له مثل ما كان يعمل مقيمًا صحيحًا))؛ رواه البخاري.
কোন বান্দা যদি অসুস্থ হয়ে যায় অথবা সফরে থাকে, তাহলে তার আমলনামায় ঐ সব আমলের সাওয়াব লেখা হতে থাকে, যা সে সুস্থ বা মুকিম অবস্থায় করতো(বুখারী)

৪. আসুন, আমরা ফরয সালাতের পাশাপাশি বেশি বেশি নফল ইবাদাত আদায় করি। বিশেষ করে তাহাজ্জুদের নামায। এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে এই অত্মঘাতী মহামারী থেকে হেফাজাত করেন। 
والله أعلم بالصواب.

লেখকঃ অধ্যাপক, 
আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, 
চট্টগ্রাম।
ইসলামিক স্কলার ও 
মুফাসসিরে কুরআন


শেয়ার করুন

Author:

0 coment rios:

You can comment here