Sunday, May 10, 2020

লাইলাতুল কদর মুমিনের জীবনে এক মহা নিয়ামত

 
।। ইমাম মাওলানা এম নুরুর রহমান।।  

“বিশ্বনবীর সেরা মুজেজা 
আল্লাহ তায়ালার শ্রেষ্ঠ দান,
কদরের রাতে নাজিল হলো 
মহাগ্রন্থ আল কুরআন।।”

লাইলাতুল কুদর এক মহিমান্বিত রজনী। যে রজনীতে সর্বপ্রথম কুরআনুল কারীম অবতীর্ণ হয়। এ রাতে ফেরেশতা জীবরাইল এর নিকট সম্পূর্ণ কুরআন অবতীর্ণ হয় যা পরবর্তিতে ২৩ বছর ধরে মহানবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট তার বিভিন্ন প্রয়োজনীয়তা এবং ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট আয়াত আকারে অবতীর্ণ করা হয়। মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই রাত সর্ম্পকে কুরআন-হাদিস শরীফে অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। এ ছাড়া মহাগ্রন্থ আল কুরআনে সূরা ক্বদর নামে স্বতন্ত্র একটি পূর্ণ সুরা অবতীর্ণ হয়েছে। এই সুরায় লাইলাতুল কদরের রাত্রিকে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

 নিম্নে এ বিষয়ে কুরআন ও হাদীস অনুসারে সাম্যক আলোচনা করার প্রয়াস পাচ্ছি।

(আরবি: لیلة القدر‎‎) আরবিতে লাইলাতুল কদর। এর অর্থ অতিশয় সম্মানিত ও মহিমান্বিত রাত বা পবিত্র রজনী। আরবি ভাষায় লাইলাতুলঅর্থ হলো রাত্রি বা রজনী এবং কদরশব্দের অর্থ সম্মান, মর্যাদা, মহাসম্মান।

এক: এ রাতের ইবাদাতের মর্যাদা ও সওয়াব বেশী, এ জন্য এ রাতকে লাইলাতুল কদর বলা হয়।
দুই: সম্মানহীন ব্যক্তি এ রাতে ইবাদাতের মাধ্যমে সম্মানিত হয়, এ জন্য এ রাতকে লাইলাতুল কদর বলা হয়।
তিন: এ রাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর মর্যাদাবান কিতাব নাযিল হয়েছে, এ জন্য এ রাতকে লাইলাতুল কদর বলা হয়।
চার: এ রাতে মর্যাদাবান ফেরেশতা অবতরণ করেন, এ জন্য এ রাতকে লাইলাতুল কদর বলা হয়।
পাঁচ: এ রাতে রহমত, বরকত ও মাগফিরাত অবতীর্ণ হয়, এ জন্য এ রাতকে লাইলাতুল কদর বলা হয়।
 
মহান আল্লাহর ভাষায়-লাইলাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। লাইলাতুল কদরের ফজিলত ও তাৎপর্য অপরিসীম। মুসলমানদের কাছে লাইলাতুল কদর এমন মহিমান্বিত বরকতময় এবং বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এ জন্য যে, এ রজনীতে পবিত্র গ্রন্থ আল-কুরআনঅবতীর্ণ হয়েছে। হাদীসে এসেছে
 عن عائِشةَ رَضِيَ اللهُ عنها قالت: قلتُ: يا رسولَ اللهِ، أرأيتَ إنْ عَلِمْتُ  أيُّ ليلةٍ ليلةُ القَدرِ، ما أقولُ فيها؟ قال: قُولي: اللَّهُمَّ، إنِكَّ عَفُوٌّ تُحِبُّ العَفوَ فاعْفُ عَنِّي
পুণ্যময় রাত্রি সম্পর্কে মহানবী সা. কে তার স্ত্রী আয়েশা  রা. লাইলাতুল কদর সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল ! আমি যদি লাইলাতুল কদর পাই তখন কী করব? তখন নবী মত দেন, তুমি বলবে, হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করে দিতে ভালোবাসেনঅতএব, আমাকে ক্ষমা করুন। (তিরমিযি) আল্লাহ পবিত্র কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেন,
 إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ -   وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ - لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ - تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ - سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ .
নিশ্চয়ই আমি তা (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি কদরের রাতে। আর কদরের রাত সম্বন্ধে তুমি কি জানো? কদরের রাত হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেশতারা ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, বিরাজ করে উষার আবির্ভাব পর্যন্ত। (সূরা আল-কদর, আয়াত ১-৫)

কদরের রাত্রের যাবতীয় কাজের ইঙ্গিত দিয়ে এ রজনীর অপার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে অন্যত্র ইরশাদ করেছেন, শবে বরাত বা ভাগ্য রজনীকে স্বয়ং আল্লাহ পাক স্বীয় কুরআন শরীফ-এ সূরা আদ দোখানএর ৩-৪ নম্বর আয়াত শরীফে ليلة المبارك (বরকত পূর্ণ রাত) হিসেবে উল্লেখ করে  আল্লাহ তাআলা তিনি ইরশাদ করেন-
انا انزلناه فى ليلة مباركة انا كنا منذرين. فيها يفرق كل امر حكيم
অর্থ: নিশ্চয়ই আমি উহা (কুরআন শরীফ) এক রবকতপূর্ণ রাত্রিতে নাযিল করেছি। অর্থাৎ নাযিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী, ওই রাত্রিতে সমস্ত হিকমতপুর্ণ কাজসমূহের বণ্টন করা হয় তথা বণ্টনের ফায়সালা করা হয়।(সূরা আদ দুখান, আয়াত:৩-৪)
কুরআনের সুরা কদরে উল্লেখ আছে, হাজার মাস ইবাদতে যে পূন্য হয়, কদরের এক রাতের ইবাদতে তার চেয়ে উত্তম। লাইলাতুল কদরের রাতে সৎ এবং ধার্মিক মুসলমানদের ওপর আল্লাহ তাআলা  অশেষ রহমত ও নিআমত বর্ষিত হয়। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস-
أنس بن مالك قال: قال رسول الله يَةِ: «إذا كان ليلة القدر نزل جبريل عليه السلام في كبكبة من الملائكة يصلون على كل عبد قائم أو قاعد يذكر الله عز وجل ؛ فإذا كان يوم عيدهم يعني يوم فطرهم باهى
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদর পেলো কিন্তু ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে কাটাতে পারলো না, তার মতো হতভাগা দুনিয়াতে আর কেউ নেই। কদরের রাতের ইবাদতের সুযোগ যাতে হাতছাড়া হয়ে না যায় সেজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ দশ দিনের পুরো সময়টাতে ইতেকাফরত থাকতেন। (মুসলিম, হাদিস নং : ১১৬৭)

কদর নামকরণের কারণ
যেহেতু এ রজনী অত্যন্ত মহিমান্বিত ও সম্মানিত তাই এ রজনীকে লাইলাতুল কদর বলা হয়ে থাকে। আবার এ রাত্রে যেহেতু পরবর্তী এক বৎসরের অবধারিত বিধিলিপি ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয় সে কারণেও এ রজনীকে কদরের রজনী বলা হয়।
 
সূরা কদর অবতীর্ণ হওয়ার পটভূমি
লাইলাতুল কদর উম্মতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য জন্য এক নিয়ামত। আল্লাহ তায়ালা এ রাতের মাধ্যমে পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতের উপর আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছেন। লাইলাতুল কদরকে শরীয়তসিদ্ধ করার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্ণিত রয়েছে। নিম্নে তা উল্লেখ করা হলো-

ইবনে আবি হাতিম রহ. সূত্রে বর্ণিত আছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার বনী ইসরাঈলের জনৈক মুজাহিদ প্রসঙ্গে আলোচনা করলেন। যিনি এক হাজার মাস অবিরতভাবে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছেন। এ ঘটনা শুনে মুসলমানগণ আশ্চর্য হলেন। তখন আল্লাহ তায়ালা সুরা কদর নাযিলের মাধ্যমে লাইলাতুল কদরের ফযিলত ঘোষণা করে দিলেন।

ইবনে জারীর রহ. সূত্রে বর্ণিত আছে, বনী ইসরাইলের জনৈক ব্যক্তি সারা রাত ইবাদতে মগ্ন থাকতন এবং সকাল হলে সন্ধ্যা পর্যন্ত জিহাদে মগ্ন থাকতেন। এভাবে তিনি এক হাজার মাস অতিবাহিত করেন। এরই পরিপেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা সুরা কদর নাযিল করেন।

ইবনে আবি হাতিম রহ. সূত্রে আরো বর্ণিত আছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার বনী ইসরাইলের চারজন ব্যক্তি সম্পর্কে আলোচনা করলেন, যারা আশি বছর আল্লাহর ইবাদত করেছেন, এক মুহুর্তও আল্লাহর নাফরমানিতে লিপ্ত হননি। তারা হলেন- আইয়ুব, যাকারিয়া, হিযকিল বিন আজুয ও ইউশাবিন নুন রহ. এ ঘটনা শুনে সাহাবায়ে কেরাম আশ্চর্য হলেন। তখন জিবরাঈল আ. এসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, এ ঘটনা শুনে আপনার উত্তম আশ্চর্য হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা এর চেয়েও উত্তম বিষয় সম্পর্কে আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। অতঃপর তিনি সুরা কদর তিলাওয়াত করেন।

উপরোক্ত বর্ণনা থেকে বুঝা যায়, পূর্ববর্তী নবীগণের উম্মতগণ অধিক আয়ু পাওয়ার কারণে বেশি পরিমাণ আমল করতে পারতেন। কিন্তু উম্মতে মুহাম্মাদীর আয়ুকাল হৃাস পাওয়ায় তারা সে পরিমাণ আমল করতে পারেন না। ফলে আল্লাহ তায়ালা পূর্ববর্তী নবীগণের উম্মতের উপর শেষ নবীর উম্মতদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদানের নিমিত্তে লাইলাতুল কদরনাম মহিমান্বিত এক রজনী প্রদান করেন। যা হাজার মাস অপেক্ষা অধিক ফযিলতপূর্ণ।
 
লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব
লাইলাতুল কদর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রজনী। নিম্নে কুরআন ও হাদীসের আলোকে উক্ত রাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরা হলো-

কুরআন নাযিলের রজনী
বিশ্বমানবতার মুক্তির সনদ মহাগ্রন্থ আল কুরআন রমযান মাসের লাইলাতুল কদরে অবতীর্ণ হয়। এ রাত্রেই সর্বপ্রথম লাওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে কুরআন অবতীর্ণ হয়। পরবর্তী পর্যায়ক্রমে ২৩ বছর যাবত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর অবতীর্ণ হয় মহাগ্রন্থ আল কুরআন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ
নিশ্চয় আমি একে (পবিত্র কুরআন) অবতীর্ণ করেছি কদরের রাত্রিতে। কুরআন নাযিলের রজনী হিসাবে লাইলাতুল কদরঅত্যন্ত তাৎপর্যবহ একটি রজনী।

হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম রজনী
লাইলাতুল কদর- এমন এক রাতের নাম, যা হাজার মাস অপেক্ষা অধিক মর্যাদাসম্পন্ন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ.
লাইলাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।
উপরোক্ত আয়াত থেকে প্রতীয়মান, লাইলাতুল কদর ৮৩ বছর ৪ মাস অপেক্ষা অধিক মর্যদাময়। অর্থাৎ এ রাতের ইবাদত ৮৩ বছর ৪ মাসের ইবাদতের চেয়ে অধিক ফযিলতপূর্ণ। অতএব এ রাত ফযিলতপূর্ণ রাতসমূহের মধ্যে অন্যতম।

ফেরেশতাগণের আগমন
লাইলাতুল কদরে জিবরাঈল আ. সহ অন্যান্য ফেরেশতাগণ পৃথিবীতে আগমন করেন। তারা সারা বছরের নির্ধারিত বিষয়াবলী সঙ্গে নিয়ে আসেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
تَنَزَّلُ الْمَلائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيها بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ
প্রত্যেক কাজের জন্য ফেরেশতাগণ ও রূহ তাদের প্রতিপালকের নির্দেশক্রমে অবতীর্ণ হন। আলোচ্য আয়াতে রূহ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- জিবরাঈল আ.। কদরের রাতে জিবরাঈল আ. সহ অন্যান্য ফেরেশতাগণের আগমনের ব্যাপারে হাদীস শরীফে এসেছে-
إِذَا كَانَ لَيْلَةُ الْقَدْرِ نَزَلَ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ فِي كَبْكَبَةٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ يُصَلُّونَ عَلَى كُلِّ عَبْدٍ قَائِمٍ أَوْ قَاعِدٍ يَذْكُرُ اللهَ عَزَّوَجَلَّ.
কদরের ফজিলত বোঝানোর জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে কদরনামে আলাদা একটি সূরা অবতীর্ণ করেন। কেবল কোরআন নয় বরং হাদিসেও কদরের ফজিলত রয়েছে বলে প্রমাণ রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে আরো ঘোষণা করেছেন
حم  -  وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ - إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ - فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ
হা-মীম। শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। আমি একে নাজিল করেছি। এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়। (সূরা আদ দুখান, আয়াত : ১-৪)

হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, শবে কদরে হজরত জিবরাইল (আ.) ফেরেশতাদের বিরাট এক দল নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং যত নারী-পুরুষ নামাজরত অথবা জিকিরে মশগুল থাকে, তাদের জন্য রহমতের দোয়া করেন। (তাফসিরে মাজহারি)

মিশকাত শরিফে উল্লেখ রয়েছে, হজরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, মহানবী (সা.) এরশাদ করেন, ‘যদি তোমরা কবরকে আলোকময় পেতে চাও তাহলে লাইলাতুল কদরে জাগ্রত থেকে ইবাদত কর। রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, যদি কেউ ঈমানের সঙ্গে সাওয়াব লাভের খাঁটি নিয়তে লাইলাতুল কদর কিয়ামুল্লাইল বা তাহাজ্জুদে অতিবাহিত করে তবে তার পূর্ববর্তী সকল গোনাহ ক্ষমা করা হবে। (বুখারি, হাদিস নং : ৬৭২)

লাইলাতুল কদরের মর্যাদা, বৈশিষ্ট্য ও ফযীলাত
সংক্ষেপে লাইলাতুল কদরের মর্যাদা, বৈশিষ্ট্য ও ফযীলাত নিম্নরূপ:

(1) এ রাতে আল্লাহ তাআলা পুরা কুরআন কারীমকে লাউহে মাহফুয থেকে প্রথম আসমানে নাযিল করেন। তাছাড়া অন্য আরেকটি মত আছে যে, এ রাতেই কুরআন নাযিল শুরু হয়। পরবর্তী ২৩ বছরে বিভিন্ন সূরা বা সূরার অংশবিশেষ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ঘটনা ও অবস্থার প্রেক্ষিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামর উপর অবতীর্ণ হয়।
(২) এ এক রজনীর ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম।
(৩) এ রাতে পৃথিবীতে অসংখ্য ফেরেশতা নেমে আসে এবং তারা তখন দুনিয়ার কল্যাণ, বরকত ও রহমাত বর্ষণ করতে থাকে।
(৪) এটা শান্তি বর্ষণের রাত। এ রাতে ইবাদত গুজার বান্দাদেরকে ফেরেশতারা জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তির বাণী শুনায়।
(৫) এ রাতের ফাযীলত বর্ণনা করে এ রাতেই একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল হয়। যার নাম সূরা কদর।
(৬) এ রাতে নফল সালাত আদায় করলে মুমিনদের অতীতের সগীরা গুনাহগুলো মাফ করে দেয়া হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ قَامَ لَيْلَةُ الْقَدْرِ إِيْمَانًا وَّاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
অর্থ : যে ব্যক্তি ঈমান ও সাওয়াব লাভের আশায় কদরের রাতে নফল সালাত আদায় ও রাত জেগে ইবাদত করবে আল্লাহ তার ইতোপূর্বের সকল সগীরা (ছোট) গুনাহ ক্ষমা করেদেন। (বুখারী, হাদীস নং : ১৯০১; মুসলিম, হাদীস নং : ৭৬০)

কোন রাতটি লাইলাতুল কদর?
লাইলাতুল কদর কোন রাত্রি? এ নিয়ে অনেক মতানৈক্য রয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ রাত্রি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। কিন্তু দুই ব্যক্তির মধ্যে বিরাজমান দ্বন্দ্ব নিরসনে তিনি তা ভুলে যান। এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে এসেছে-
عن عُبَادَةُ بْنُ الصَّامِتِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَرَجَ يُخْبِرُ بِلَيْلَةِ الْقَدْرِ فَتَلَاحَى رَجُلَانِ مِنْ الْمُسْلِمِينَ فَقَالَ إِنِّي خَرَجْتُ لِأُخْبِرَكُمْ بِلَيْلَةِ الْقَدْرِ وَإِنَّهُ تَلَاحَى فُلَانٌ وَفُلَانٌ فَرُفِعَتْ وَعَسَى أَنْ يَكُونَ خَيْرًا لَكُمْ الْتَمِسُوهَا فِي السَّبْعِ وَالتِّسْعِ وَالْخَمْسِ.
হযরত উবাদাহ বিন সামিত রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার লাইলাতুল কদর সম্পর্কে সংবাদ দেয়ার জন্য বের হলেন। তখন দুজন মুসলমানের মাঝে ঝগড়া-দ্বন্দ্ব চলছিল। (তাদের দ্বন্দ্ব নিরসন করে) রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- আমি তোমাদেরকে লাইলাতুল কদরের সংবাদ দেয়ার জন্য বের হয়েছিলাম, কিন্তু অমুক অমুক ব্যক্তি ঝগড়া করছিল। ফলে এর নির্দিষ্ট তারিখের জ্ঞান উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। আশা করি এতেই তোমাদের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। অতএব তোমরা এ রাত্রিকে সপ্তম, নবম ও পঞ্চম রাত্রিতে অনুসন্ধান কর।

লাইলাতুল কদরের তারিখ সম্পর্কে প্রায় চল্লিশ মত রয়েছে।  এখানে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মতামত নিয়ে আলোচনা করছি।

এক: অধিক যুক্তিযুক্ত মত হলো- লাইলাতুল কদর রমযান মাসের শেষ দশকে হয়ে থাকে। শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিসমূহে শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা অধিক। এ রাত বিভিন্ন বছর শেষ দশকের বিভিন্ন বেজোড় রাত্রিতে পরিবর্তিত হয়ে থাকে। তাই রমযানের শেষ দশক, বিশেষত শেষ দশকের বিজোড় রাত্রিগুলো এ অনুসন্ধান করতে হবে। এ প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছে-
تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ
‘‘রমাযানের শেষ দশদিনে তোমরা কদরের রাত তালাশ কর।’’ (বুখারী,হাদীস নং২০২০;  মুসলিম, হাদীস নং : ১১৬৯)

দুই: আর এটি রমযানের বেজোড় রাতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
تَحَرُّوْا لَيْلَةُ الْقَدْرِ فِي الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ
‘‘তোমরা রমাযানের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে কদরের রাত খোঁজ কর।’’ (বুখারী,হাদীস নং : ২০১৭)

তিন: এ রাত রমযানের শেষ সাত দিনে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
فَمَنْ كَانَ مُتَحَرِّيْهَا فَلْيَتَحَرِّهَا فِي السَّبْعِ الأَوَاخِرِ
‘‘যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদর (কদরের রাত) অন্বেষণ করতে চায়, সে যেন রমাযানের শেষ সাত রাতের মধ্য তা অন্বেষণ করে।’’ (বুখারী,হাদীস নং : ২০১৫; মুসলিম, হাদীস নং : ১১৬৫)

চার: রমাযানের ২৭ শে রজনী লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। উবাই ইবনে কাব হতে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন যে,
وَاللهِ إِنِّيْ لأَعْلَمُ أَيُّ لَيْلَةٍ هِيَ اللَّيْلَةُ الَّتِيْ أَمَرَنَا رَسُوْلُ اللهِ -صلى الله عليه وسلم- بِقِيَامِهَا هِىَ لَيْلَةُ سَبْعٍ وَعِشْرِيْنَ
আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি যতদূর জানি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে যে রজনীকে কদরের রাত হিসেবে কিয়ামুল্লাইল করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা হল রমাযানের ২৭ তম রাত। (মুসলিম, হাদীস নং : ৭৬২)

আব্দুল্লাহ বিন উমার থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
مَنْ كَانَ مُتَحَرِّيْهَا فَلْيَتَحَرِّهَا لَيْلَةَ السَّبْعِ وَالْعِشْرِيْنَ
‘‘যে ব্যক্তি কদরের রাত অর্জন করতে ইচ্ছুক, সে যেন তা রমাযানের ২৭শে রজনীতে অনুসন্ধান করে। (মুসনাদে আহমাদ, খণ্ড-২, পৃ. ১৫৭)

পাঁচ: কদরের রাত হওয়ার ব্যাপারে সম্ভাবনার দিক থেকে পরবর্তী দ্বিতীয় সম্ভাবনা হল ২৫ তারিখ, তৃতীয় হল ২৯ তারিখে। চতুর্থ হল ২১ তারিখ। পঞ্চম হল ২৩ তারিখের রজনী।

ছয়: আরেকটি মত হল- মহিমান্বিত এ রজনীটি স্থানান্তরশীল। অর্থাৎ প্রতি বৎসর একই তারিখে বা একই রজনীতে তা হয় না এবং শুধুমাত্র ২৭ তারিখেই এ রাতটি আসবে তা নির্ধারিত নয়। আল্লাহর হিকমত ও তাঁর ইচ্ছায় কোন বছর তা ২৫ তারিখে, কোন বছর ২৩ তারিখে, কোন বছর ২১ তারিখে, আবার কোন বছর ২৯ তারিখেও হয়ে থাকে।

সাত: গুনিয়াতুল তালেবীন কিতাবে এসেছে- পবিত্র কুরআন শরীফের সুরা কদর এর আয়াত سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ এর هي শব্দটি ২৭ শব্দের পরে এসেছে। এ থেকে বুঝা যায় যে, লাইলাতুল কদর ২৭ তারিখে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আট: কারো কারো মতে-
 ليلة القدر تسعة أحرف وقد اعيدت في السورة ثلاث مرات فذلك سبع وعشرون
লাইলাতুল কদরএর মধ্যে নয়টি অক্ষর রয়েছে। লাইলাতুল কদরসুরায় তিনবার এসেছে। ফলে তা অক্ষরের সংখ্যা হয়েছে (৯x৩) ২৭টি। এজন্য লাইলাতুল কদর ২৭ তারিখ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কাফী ও বাহরে মুহীত গ্রন্থাকারের মতে-
من قال لزوجته أنت طالق ليلة القدر طلقت ليلة سبع وعشرين لأن العامة تعتقد أنها ليلة القدر
যদি কেউ তার স্ত্রীকে বলে যে, তুমি লাইলাতুল কদরে তালাক। তাহলে সে ২৭ তারিখে তালাক হয়ে যাবে। কেননা সর্বসাধারণ মনে করেন যে, ২৭ তারিখই লাইলাতুল কদর। অতএব বুঝা গেল যে, ২৭ তারিখ লাইলাতুল কদরের অধিক সম্ভাবনাময় একটি রাত।

এ রাতকে অস্পষ্ট করে গোপন রাখার কারণ
এ রাতের পুরস্কার লাভের আশায় কে কত বেশি সক্রিয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এবং কত বেশি সচেষ্ট হয়, আর কে নাফরমান ও আলসে ঘুমিয়ে রাত কাটায় সম্ভবতঃ এটা পরখ করার জন্যই আল্লাহ তাআলা এ রাতকে গোপন ও অস্পষ্ট করে রেখেছেন।
লাইলাতুল কদর বুঝার আলামত
লাইলাতুল কদরের বিভিন্ন আলামত রয়েছে। এব্যাপারে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
وَمِنْ أَمَارَتِهَا أَنَّهَا لَيْلَةٌ بَلْجَةٌ صَافِيَةٌ سَاكِنَةٌ لَا حَارَّةٌ، وَلَا بَارِدَةٌ كَأَنَّ فِيهَا قَمَرًا، وَإِنَّ الشَّمْسَ تَطْلُعُ فِي صَبِيحَتِهَا مُسْتَوِيَةً لَا شُعَاعَ لَهَا.
লাইলাতুল কদরের আলামত হলো-
এক: এ রাত স্পষ্ট আলোকোজ্জল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকে।
দুই: এ রাতে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করে। এ রাতে চাঁদের আলো থাকে।
তিন: এ রাতের পূর্ববর্তী ভোরে সূর্য কিরণহীন অবস্থায় উদিত হয়।
চার: কদরে পৃথিবীতে অধিক সংখ্যক ফেরেশতার আসা-যাওয়ার কারণে সূর্য তাদের পাখার আড়াল পড়ে যায়। যার ফলে সে রাতে সুর্যের তাপ থাকে কম।
পাঁচ: এ রাতটি হয় আলোকোজ্জ্বল। যা সাধারণত অন্য রাতে এত বেশি আলোকিত হয় না।
ছয়: অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থানসহ প্রতিটি স্থানকেই মনে হয় যেন স্বর্গীয় আলোয় আলোকিত।
সাত: রমাদান মাসে যারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সামর্থ হয়েছে; তারা এ রাতে ফেরেশতাদের সালাম শুনতে পায়।
আট: এ রাতের শ্রেষ্ঠ আলামত হলো, আল্লাহ তাআলা এ রাতের বান্দার দোয়া কবুল করেন।
নয়: এ পবিত্র রাতের শেষ ভাগে হালকা রহমতের বৃষ্টি বর্ষিত হয়।
দশ: আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন, এ রাতের একটি বিশেষ নিদর্শন হলো- সৃষ্টি জীবের প্রতিটি বস্তুকেই সেজদারত অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়।
এগারো: লাইলাতুল কদরের রাতের ইবাদতে মুমিন মুসলমান তাদের অন্তরে অন্যরমক প্রশান্তি লাভ করে।
বারো: বিশেষ করে এ রাতে মুমিনগণ কুরআন তেলাওয়াতে তারা খুব আনন্দ পায়।  সকালে হালকা আলোকরশ্মিসহ সূর্যোদয় হবে। যা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মত। (সহীহ ইবনু খুযাইমাহ, হাদীস নং : ২১৯০ ; বুখারী, হাদীস নং : ২০২১ ; মুসলিম, হাদীস নং : ৭৬২)

রমাদানুল মুবারকের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে আল্লাহ তাআলার ইবাদত-বন্দেগিতে অতিবাহিত করলে এ মর্যাদার রাতের সন্ধান পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে লাইলাতুল কদর পাওয়ার জন্য কোনো প্রকার নিদর্শন প্রকাশ পাওয়া আবশ্যক নয়। লাইলাতুল কদর প্রাপ্তিতে রমজানের শেষ দশকের প্রতিটি দিন ইশা এবং ফজরের নামাজ জামাআতের সঙ্গে আদায় করা জরুরি। যদি কেউ ইশা এবং ফজর নামাজ জামাআতের সঙ্গে আদায় করে তবে ওই ব্যক্তি সারা রাত জেগে ইবাদত করার সাওয়াব পাবে। আর সে রাতে যদি লাইলাতুল কদর পাওয়া যায়, তবে তাতে কদরের রাত পাওয়ার মর্যাদা লাভ হয়ে যাবে।

আলোচনার প্রান্তটিকায় এসে বলতে পারি যে, লাইলাতুল কদর মুমিনের জীবনে অনেক বড় নিআমত। এই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে আল্লাহ তাআলা নিকট থেকে বান্দা মাগফেরাত কামনা করবে। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে লাইলাতুল কদরে যথাযথ ইবাদত বন্দেগি করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: বহুগ্রন্থ প্রণেতা
সেক্রেটারি:
শারীয়া কাউন্সিল ব্যাডফোরড ও মিডল্যনড ইউ কে- 
ইমাম ও খাতিব:
মাসজিদুল উম্মাহ লুটন ইউ কে
সত্যয়ান কারী চেয়ারম্যন:
নিকাহ নামা সার্টিফিকেট ইউ কে
 প্রিন্সিপাল:
আর রাহমান একাডেমি ইউ কে
পরিচালক:
আর-রাহমান এডুকেশন ট্রাস্ট ইউ কে
📞07476136772 📞 07476 961067
nrahmansky@googlemail.com
Arrahmaneducationtust@gmail.com
https://www.facebook.com/Imam.Nurur
https://www.facebook.com/ARET.OR.UK/
https://www.youtube.com/user/nurur9



শেয়ার করুন

Author:

0 coment rios:

You can comment here