Saturday, May 2, 2020

আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও মানবকল্যাণে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভূমিকা


।। ফজলে এলাহি মামুন।।

ভূমিকা
ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা  ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ব্যাংকিং ক্ষেত্রে ইসলামের অর্থনৈতিক নীতিমালা বাস্তবায়ন করা ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রধান উদ্দেশ্য। অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মৌলিক প্রয়োজন পূরণ, দারিদ্র বিমোচন, অপচয় ও অপব্যয় রোধ ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার লক্ষ্য। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ব্যক্তিস্বার্থ নয়, সামাজিক কল্যাণের আদর্শই মূল চালিকাশক্তি। নৈতিক মূল্যবোধের বিধান অনুসরণ করে সামাজিক উন্নয়নের সাথে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমন্বয় সাধন করা এ ব্যবস্থার অন্যতম কর্মকৌশল। সম্পদ অর্জন ও এর সুষ্ঠূ বণ্টন সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করে। শুধু সম্পদ উৎপাদন নয়, উৎপাদিত সম্পদের বণ্টনে সার্বজনীন কল্যাণের আদর্শ অনুসরণ ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রাণশক্তিরূপে কাজ করে। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও সার্বিক মানবকল্যাণে কাজ করে।

ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা আর্থিক মধ্যস্থতার এমন এক পদ্ধতি যা তার কার্যাবলী এমনভাবে পরিচালনা করে যাতে ইসলামী অর্থনীতির উদ্দেশ্য অর্জন তথা অর্থনীতিতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা আর্থিক লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বৈষম্য দূরীকরণ, ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা এবং আর্থ সামাজিক অবকাঠামো তৈরি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, নীতি ও কর্মধারা ব্যাপকভাবে জনগণের কল্যাণে নিবেদিত। এ ব্যবস্থা গুটিকয়েক মানুষের লোভের চাহিদা পূরণের জন্য লাভকে সব কিছুর ওপর প্রাধান্য না দিয়ে সমাজের সকল মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণকে অগ্রাধিকার দেয়। এভাবে আর্থ-সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠায় ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা কাজ করে। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পদ আবর্তনের নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ ব্যাপারে আল কুরআনে বলা হয়েছে,
كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاء مِنكُمْ   
যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান কেবল তাদের মধ্যেই সম্পদ আবর্তন না করে(আল-কুরআন, ৫৯:৭) এ নীতি মেনে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা  উৎপাদন বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করার সাথে সাথে উৎপাদিত পণ্যের সামাজিক বণ্টনের নীতিকে গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ সম্পদ উৎপাদনই লক্ষ্য বা শেষ কথা নয়। কী ধরনের সম্পদ কার জন্য উৎপাদন করা হবে এবং সেই উৎপাদিত সম্পদ কীভাবে বেশি সংখ্যক উপকারভোগীর কাছে পৌঁছানো হবে এটি ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। আলোচ্য প্রবন্ধে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও মানবকল্যাণে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভূমিকা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থাঃএকটি কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক ধারা
প্রথমে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছিল চিন্তা ও তত্ত্বের মধ্যে সীমিত। বিগত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে সদ্য স্বাধীন মুসলিম দেশগুলোতে ইসলামী অর্থ ও ব্যাংক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যাশা থেকে এ ব্যাপারে চিন্তা ও গবেষণা জোরদার হয়। ফলে ষাটের দশকে মিসরে আধুনিক যুগের প্রথম ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়।

 ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা কাঠামোগত দিক থেকে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার মতো মনে হলেও আদর্শ ও মুল্যবোধের দিক থেকে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। ইসলামি ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য হচ্ছে একটি সুদমুক্ত শোষণহীন সমাজ গড়ে তোলা যার মাধ্যমে ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে জুলুম ও নিপীড়নমুক্ত আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো গড়ে ওঠে। জনগণের দুঃখদুর্দশা লাঘবের উদ্দেশ্যে সমাজের কল্যাণ সুনিশ্চিত করার জন্য মহান আল্লাহ প্রদত্ব সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করার জন্য এবং শোষণমুক্ত ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠা করার জন্য ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন। (ড. মুহম্মদ আবদুল মান্নান চৌধুরী, ইসলামি অর্থনীতির রূপরেখা: তত্ত্ব ও প্রয়োগ (ঢাকা: চয়নিকা প্রকাশনী, ৩৮/২ক বাংলাবাজার) ২০১৪ ,৩৭০ ,৪র্থ মুদ্রণ) 

এ ব্যাংক সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে শরিয়ার আলোকে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা করে থাকে। শুধু মুনাফা অর্জনই লক্ষ্য থাকে না বরং শরিয়া পরিপালনসহ জনগণের কল্যাণ-অকল্যাণের প্রতিও বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হয়। জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, বেকারত্ব দূরীকরণ দারিদ্র বিমোচন, অর্থনীতিতে ন্যায় বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে। দরিদ্র জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রয়োজনে কর্জে হাসানা (লাভমুক্ত ঋণ) প্রদান করে। (মাওলানা মোঃ ফজলুর রহমান আশরাফী, ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা (নলেজ পাবলিকেশন্স), ২০১৫, ২৬)

মানবকল্যাণ সাধন ঈমানদারদের অপরিহার্য কর্তব্য
কল্যাণমানে হিত, মঙ্গল, কুশল ও সুখসমৃদ্ধি। (শৈলেন্দ্র বিশ্বাস, সংসদ বাঙ্গালা অভিধান (ঢাকা: সাহিত্য সংসদ, চতুর্থ সংস্করণ), ১৯৮৪, ১৩৬) শব্দটির আরবি হল হাসানাহ’ ‘খায়রবা ফালাহ। হাসানাহমানে হল কল্যাণ, উত্তম। খায়রমানে হলো ভালো, উত্তম, শ্রেষ্ঠ, চমৎকার। (ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান, আল-মুনীর আরবী-বাংলা অভিধান (ঢাকা: দারুল হিকমাহ বাংলাদেশ), ২০১০,২৯২) আর ফালাহমানে হল সাফল্য, সফলতা, কল্যাণ, উন্নতি, নাজাত ও পরিত্রাণ।  (ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, আধুনিক আরবি-বাংলা অভিধান (ঢাকা: রিয়াদ প্রকাশনী) ২০০৫ , ৬১৭) 

শব্দ তিনটির অর্থ প্রায় এক। আর তা হলো কল্যাণ, উন্নয়ন ও সফলতা। ইসলামি শরিয়া-এর মূল লক্ষ্য হলো মানবকল্যাণ সাধন। মানুষের দৈহিক, মানসিক ও আর্থিক কল্যাণ সাধন এবং মানুষের জীবন মানের উন্নয়ন মানবকল্যাণ বলে বিবেচিত। ইমাম গাযালী (র.)-এর মতে, যা কিছু ঈমান বা বিশ্বাসের বুদ্ধিবৃত্তি, প্রাণ বা জীবন, মাল বা অর্থনীতির ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য কল্যাণকর, সেগুলোই মানবকল্যাণ। আর যা কিছু এ সবকে নষ্ট করে অর্থাৎ জীবনের কল্যাণ, অর্থ বা অর্থনীতি কিংবা মালের কল্যাণের বিরোধী হয়, যা কিছু ঈমানের বিরোধী হয়, যা কিছু মানুষের বিবেক-বুদ্ধি নষ্ট করে, সেগুলোকে মাফাসিদবা মানব অকল্যাণ বলে গণ্য করা হয়। (আবু হামিদ আল গাযালী, আল-মুসতাসফা মিন ইলম আল-উসূল, (কায়রো: আল-মাকতাবাহ আল-তিজারিয়্যাহ), ১৯৭৩, খ. ১, পৃ. ১৩৯-১৪০, ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম, লামুল মুওয়াক্কিঈন, (কায়রো: দারুল হাদিস), ২০০৬, খ. ৩, পৃ. ৫।)

মানবকল্যাণের পরিধি অনেক ব্যাপক। মূলত আর্ত-মানবতার সেবা করা, মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, রাস্তা-ঘাট ও সেতু নির্মাণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র বিমোচন, মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা প্রদান ইত্যাদি সবই মানবকল্যাণের পরিধিভুক্ত। আর এসব জনহিতকর কর্ম সম্পাদনে ইসলামি দিক নির্দেশনা সুস্পষ্ট। এক্ষেত্রে মহানবি (সা.) এর কর্মময় জীবন অনুপ্রেরণার উৎস এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য অনুসরণীয়।
প্রিয় নবি মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন আর্ত-মানবতার সেবায় নিবেদিত প্রাণ। পবিত্র কুরআনে তাঁকে বিশ্বমানবতার জন্য রহমত ও কল্যাণকামী বলে অভিহিত করা হয়েছে। আল্লাহ পাক বলেন,
لَقَدْ جَاءكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُم بِالْمُؤْمِنِينَ رَؤُوفٌ رَّحِيمٌ     
অবশ্যই তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের নিকট এক রাসুল এসেছে। তোমাদেরকে যা বিপন্ন করে তা তার জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু।(আল-কুরআন, ৯:১২৮)
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ        
আমি তো আপনাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।(আল-কুরআন, ২১:১০৭)

উপরিউক্ত আয়াতদ্বয়ে মহানবি (সা.) এর বাস্তব চরিত্র চিত্রায়ণ করে তাঁকে কল্যাণকামীরূপে ঘোষণা দিয়ে মূলত মুসলিম উম্মাহকে মানবতার কল্যাণে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সর্বোপরি মানবতার কল্যাণ সাধন ঈমানদারদের অপরিহার্য কর্তব্য। মানবকল্যাণ সাধনে ইসলামের রয়েছে কতিপয় মৌলিক অর্থনৈতিক কর্মসূচি। যেমন জাকাত, উশর, খারাজ, ওয়াকফ, সাদাকা ও কর্জে হাসানা। এসব কর্মসূচি মূলত ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার অংশ বিশেষ, যার সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানবতার সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করা যেতে পারে। আর ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে মানবতার সার্বিক কল্যাণ সাধনে ইসলামের অর্থনৈতিক কর্মসূচি  বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে দুভাগে ভাগ করা যায়।
(এক) সাধারণ উদ্দেশ্য,
(দুই) প্রায়োগিক উদ্দেশ্য।

১. সাধারণ উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে-
১.১ সম্পদের ইনসাফ ভিত্তিক বণ্টন নিশ্চিত করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অবিচার, শোষণ, জুলুম ও বৈষম্য দূর করা
১.২ ব্যাংকিং ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বার্থ কেন্দ্রিকতার পরিবর্তে ব্যষ্টিক ও সমষ্টিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া
১.৩  সামষ্টিক সামাজিক দায়দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সমাজের ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নে সহযোগিতা করা।

২. প্রায়োগিক উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে-
২.১ জনগণের উদ্বৃত্ত ও অলস অর্থ সংগ্রহ করে তার দ্বারা মূলধন গঠন এবং তা শরীয়াত অনুমোদিত পন্থায় বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কল্যাণসাধন।

২.২ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে উৎসাহিত করে নিম্ন আয়ের মানুষের অর্থনেতিক উন্নয়ন ও আপৎকালীন অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে সহযোগিতা করা।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মানবকল্যাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হলো:

২.৩ ব্যক্তি ও সমষ্টির কল্যাণ বিবেচনা: সম্পদ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকসমূহ ব্যক্তি ও সমষ্টির কল্যাণের প্রতি খেয়াল রাখবে। ব্যক্তির জন্য আর্থিকভাবে লাভজনক কিন্তু সমাজের জন্য তা ক্ষতিকর হলে সে ধরনের কোনো খাতে বিনিয়োগ করা ইসলামী ব্যাংকসমূহের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। যেমন ইসলামী ব্যাংক সমূহ মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণী বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো খাতে বিনিয়োগ করে না। আর্থিক মুনাফার লোভে তামাক, মাদক বা অন্য কোনো প্রকার ক্ষতিকর খাতে ইসলামী ব্যাংক কোনো বিনিয়োগ করে না।

২.৪ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার খাত বিবেচনা: শুধু মুনাফা নয়, বরং সমাজের সাবিক কল্যাণ ও প্রয়োজন পূরণের দিক থেকে অগ্রাধিকার খাতে বিনিয়োগ করা ইসলামী ব্যাংক সমূহের একটি উদ্দেশ্য। 

ইসলামী ব্যাংক সমূহ সম্পদের বৈধতা, পবিত্রতা, নিরাপত্তা ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করে । মানুষের আর্থিক প্রয়োজন মিটিয়ে জীবনকে সহজ ও সুন্দর করার জন্য নানা প্রকার কল্যাণকর সেবা ও পণ্য প্রচলন করে । সেই সাথে আর্থিক কর্মকান্ডে যাবতীয় অকল্যাণ দূর করে ।
আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা
এক সময় মানুষ মনে করতো যে, সুদ ছাড়া ব্যাংকিং ব্যবস্থা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। সে সংশয় ইতোমধ্যে অসার প্রমাণিত হয়েছে। সুদ থেকে মুক্ত হয়ে লাভ-লোকসানের অংশীদারিত্বমূলক কারবার কিংবা পণ্যের বেচাকেনা বা ইজারা পদ্ধতিতে ব্যাংকিং ব্যবসা সম্ভব, তা ইসলামী ব্যাংকসমূহ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। সুদের কারণে যারা ব্যাংক ব্যবস্থার সেবা গ্রহণ থেকে দূরে ছিলেন, ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা তাদের জন্যও আস্থার একটি ঠিকানা তৈরি করেছে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা জনকল্যাণ ও সার্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে। ইসলামী ব্যাংকগুলোর রয়েছে জনকল্যাণমুখী বিভিন্ন বিশেষ বিনিয়োগ প্রকল্প।

নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জীবনমান উন্নয়নে এসব প্রকল্প ভূমিকা রাখছে।  ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা তার সকল কার্যক্রমে সুনীতি ও উন্নয়নকে প্রাধান্য দেয়। ব্যাংকিং খাতের সবুজায়নে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সার্বজনীন কল্যাণে নিয়োজিত ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা তামাক ও মাদক দ্রব্য কিংবা পরিবেশ বিরোধী খাতে বিনিয়োগ করেনি। ধূসর কোনো বিনিয়োগে এই ব্যাংকিং ব্যবস্থার অংশগ্রহণ নেই। উন্নয়ন কর্মকান্ডে নারীকে অধিকতর সম্পৃক্ত করার জন্য ইসলামী ব্যাংকসমূহ শুরু থেকেই ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়াও নারীর ক্ষমতায়নে ইসলামী ব্যাংকসমূহে পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক নিম্নে আলোচিত হলো।

ক. আর্থ-সামাজিক ও আর্থিক উন্নয়নের সমন্বয়
ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ইসলামের অর্থনৈতিক ও আর্থিক নীতিমালা বাস্তবায়ন করে। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার  কাজ হলো আর্থিক লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা। ব্যক্তিস্বার্থ নয়, সামাজিক কল্যাণের আদর্শ ইসলামী ব্যাংকিং এর চালিকা-শক্তি। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা সামাজিক উন্নয়নের সাথে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমন্বয় চায়। এজন্য অংশীদারিত্বকে উৎসাহ দেয়। ফলে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ে। ইসলামী ব্যাংকগুলো শুধু সম্পদশালীদের নিয়ে কাজ করে না, বঞ্চিত ও অভাবী মানুষের প্রতিও দায়িত্ব পালন করে।

খ. সম্পদ উৎপাদন ও বণ্টনে জনকল্যাণের আদর্শ
সুদের কারবারে সমাজের স্বল্পবিত্ত সাধারণ মানুষের সম্পদ অল্প কিছু লোকের হাতে জমা হয়। এরপর সেই সম্পদ আরো কম মানুষের কাছে কেন্দ্রীভূত হয়। এটি ইসলামী নীতির বিপরীত। আল-কুরআনে সূরা হাশরে বলা হয়েছে, “যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান কেবল তাদের মধ্যে যেনো সম্পদ আবর্তন না করে।এই নীতি অনুসরণ করে ইসলামী ব্যাংকসমূহ জনগণের ছোট-বড় সব ধরনের সঞ্চয় সংগ্রহ করে তা সার্বজনীন কল্যাণে লাগায়। সকলকে উৎপাদনে উৎসাহ দেয়। সেই সাথে উৎপাদনের সুষম বণ্টনে কাজ করে। এতে জাতীয় আয় বাড়ে। সেই আয়ের বণ্টন নিশ্চিত হয়। এই নীতি ইসলামী ব্যাংক সমূহের আর্থ-সামাজিক লক্ষ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ইসলামে সম্পদ উৎপাদনই শেষ কথা নয়। কি ধরনের সম্পদ কার জন্য উৎপাদন করা হবে এবং সেই উৎপাদিত সম্পদ কিভাবে অধিক সংখ্যক উপকারভোগীর কাছে পৌঁছানো হবে এটি ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। ইসলামী ব্যাংকসমূহ সমাজের সকল মানুষকে সঞ্চয়ে আকৃষ্ট কর। সেই সম্পদ মুষ্টিমেয় লোকের হাতে পুঞ্জীভূত না করে স্বল্পবিত্ত ও বিত্তহীনদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়। এতে অল্প টাকা বেশি লোকের কল্যাণে নিয়োজিত হয়।

গ. অর্থনীতিতে নৈতিক শৃঙ্খলার বিধান অনুসরণ
অর্থসম্পদের ন্যায়ভিত্তিক বণ্টন ও আর্থ-সামাজিক সুবিচার ইসলামী অর্থনীতির লক্ষ্য। উন্নয়নের এই নৈতিক শৃঙ্খলা ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত্তি। অর্থ-সম্পদ, মানব সম্পদ ও বস্তুগত সম্পদ ব্যবহারে নৈতিক শ্ঙ্খৃলা না থাকলে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা দেখা দেয়। বঞ্চিত মানুষের দুর্দশা বাড়ে, উন্নয়ন ব্যাহত হয়।

ঘ. মানব সম্পদ ও মানব উন্নয়ন
মানুষই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির স্থপতি। আল্লাহ তাআলার বাণী-
إِنَّ اللّهَ لاَ يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُواْ مَا بِأَنْفُسِهِمْ          
আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজ অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করতে উদ্যোগী হয়(আল-কুরআন, ১৩:১১)
ইহকালীন কল্যাণ ও সমৃদ্ধি অর্জন প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলার বাণী-
وَمِنْهُمْ مَنْ يَقُولُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
আর তাদের মধ্যে এমনও আছে, যারা বলে, হে আমাদের রব, আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দিন। আর আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদেরকে আগুনের আযাব থেকে রক্ষা করুন(আল-কুরআন, ২:২০১)

উপরোক্ত দুটি আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মুমিনরা তার প্রতিপালকের নিকট ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ কামনা করে আর ইহকালীন কল্যাণের জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জন করতে হয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হল মানব সম্পদ উন্নয়ন করা। মানব সম্পদ উন্নয়ন একটি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী সম্পদে পরিণত হয়। মানব সম্পদ উন্নয়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানব গোষ্ঠীর সুপ্ত প্রতিভা, প্রচ্ছন্ন শক্তি, লুকায়িত সামর্থ্য, অন্তর্নিহিত কর্মক্ষমতা, যোগ্যতা ও মেধাকে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার উপযোগী করার উপযুক্ত পরিবেশ ও ক্ষেত্র তৈরী হয়। মানব উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের আশা-আকাঙক্ষা পূরণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ইসলামে মানব সম্পদ উন্নয়নের ধারণা অনেক ব্যাপক। মানুষের আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত সকল দিক ও বিভাগ এর আওতাধীন। মানুষের স্বভাব ও অভ্যাসের উন্নয়ন এর অন্তর্ভুক্ত। মানসিক ও নৈতিক উন্নয়ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত। ইসলামের উন্নয়নের উদ্দেশ্য হলো ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণমুখী লক্ষ্য অর্জন। শরীয়াতের আলোকে এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারলে জাতি সমৃদ্ধ হবে। রাষ্ট্র উন্নত হবে। ইসলামী ব্যাংকসমূহ তার বহুমাত্রিক কর্মকৌশলের মাধ্যমে এ লক্ষ্য হাসিলে কাজ করে।
ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যাকাত ফা- পরিচালনা
ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যাকাত ফান্ড শরীয়া’ ভিত্তিক অর্থব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালনা করে থাকে। কেননা সমাজের বিবিধ সমস্যা ও রোগের প্রতিষেধক হিসেবে যাকাত ব্যবস্থা কার্যকর করা একটি অত্যাবশ্যকীয় দীনী কর্তব্য। এক্ষেত্রে যাকাতের এহেন ব্যবস্থা সমাজে বহুবিধ ধ্বংসাত্মক সমস্যার বিস্তার রোধ করে থাকে। সুতরাং বলা যায়, ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা  সামাজিক ও দীনী ন্যায়বিচার এবং পারস্পরিক সহযোগিতার নীতি প্রতিষ্ঠার কর্তব্য পালনকল্পে যাকাতলব্ধ অর্থের ব্যবস্থাপনা করে থাকে। ইসলামী ব্যাংক কর্তৃক যাকাত ফান্ড প্রতিষ্ঠা করা এবং এর পরিচালনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা নফল বা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পরিগণিত হবে। 

সারকথা হলো, যাকাতলব্ধ অর্থের পরিচালনা ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার  সামাজিক ভিত্তিরই প্রতিফলন। কেননা আল্লাহ তাআলার বাণী:
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ إِنَّ صَلاَتَكَ سَكَنٌ لَّهُمْ وَاللّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ        
তাদের সম্পদ থেকে সদাকা’ (যাকাত) গ্রহণ করুন। এর দ্বারা আপনি তাদেরকে পবিত্র করবেন এবং পরিশোধিত করবেন(আল-কুরআন, ৯:১০৩)

এই নির্দেশনা অনুযায়ী যাকাত ফরজ করা হয়েছে এবং যাকাত আদায় ও বণ্টনের মধ্যে সামাজিক তাকাফুল (পারস্পরিক পৃষ্ঠপোষকতা) বা সমাজের আর্থিক নিরাপত্তা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা নিহিত। যাকাতের সামাজিক সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয় যাকাত বণ্টনের খাতসমূহ অবগত হওয়ার মাধ্যমে। যেমন এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলার বাণী-
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاء وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِّنَ اللّهِ وَاللّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
সদাকা (যাকাত) তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য, যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণ ভারাক্রান্তদের, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়(আল-কুরআন, ৯:৬০)

মানবকল্যাণে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা
ইসলামী শরীয়াতের উদ্দেশ্য মানবতার কল্যাণ নিশ্চিত করা। ইসলমী অর্থনীতি সেই উদ্দেশ্য পূরণ করে। ইসলামী অর্থনীতির অংশরূপে ইসলামী ব্যাংকসমূহ তার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কর্ম-পদ্ধতির সকল স্তরে ইসলামী শরীআতের নীতিমালা ও আদর্শভিত্তিক সেই অর্থনীতির উদ্দেশ্য সাধনে কাজ করে। সেই নিরিখে ইসলামী ব্যাংকসমূহের উদ্দেশ্য হলো: ব্যাংকিং ক্ষেত্রে মানুষের কল্যাণ সাধন ও অকল্যাণ দূর করা। ইসলামী ব্যাংকসমূহ তার কর্মকান্ডে সকল প্রক্রিয়ায় সুদসহ সব ধরনের নিষিদ্ধ উপাদান পরিহার করে ও শরীয়াত সম্মত পন্থায় সম্পদের বৈধতা ও পবিত্রতা নিশ্চিত করবে এবং জনগণের সম্পদের নিরাপত্তা বিধান ও সর্বজনীন বৃহত্তর কল্যাণে কাজ করবে। আর্থিক ক্ষেত্রে শরীয়াতের এই উদ্দেশ্যকে সংক্ষেপে ও সহজভাবে উপস্থাপন করে ড. এম উমর চাপড়া বলেছেন, ইসলামী অর্থনীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো কল্যাণমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা। সে সমাজে সকল প্রতিষ্ঠান ন্যায়, সমতা ও স্বাধীনতার জন্য কাজ করে । ইসলামী ব্যাংকসমূহ ইসলামী অর্থনীতির উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে কাজের সকল ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কল্যাণ, সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব ও আর্থিক সুবিচার নিশ্চিত করে (ড. এম. উমর চাপড়া, ইসলাম এন্ড দ্যা ইকোনোমিক চ্যালেঞ্জ, লন্ড: ইসলামিক ফাউন্ডেশন ১৯৯৫ খ্রি. পৃ. ৭)

ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় জমা কার্যক্রমে মানবকল্যাণ
ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা সকল স্তরের জনগনের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলতে সাহায্য করে। শুধু বড়ো অংকের সঞ্চয়ের প্রতি আগ্রহী না হয়ে ছোট-বড়ো সকল জমাকারীর সম্পদ জাতীয় আর্থিক প্রবাহে নিয়োজিত করে। ইসলামী ব্যাংকসমূহ নিজেদের জমানীতির আলোকে জনকল্যাণের জন্য নতুন নতুন সেবা তৈরির মাধ্যমে সমাজে ভালো কাজে বেশি মানুষের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করে। ইসলামী  ব্যাংকসমূহ জনগণের সঞ্চয় শরীয়াত সম্মত খাতে শরীয়াত সম্মত পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করে গ্রাহককে হালাল মুনাফা অর্জনে সাহায্য করে। আর্থিক লেনদেনের সকল ক্ষেত্রে অকল্যাণকর সুদ সম্পূর্ণরূপে পরিহার করে কল্যাণকর বা হালাল পদ্ধতি অনুসরণের ফলে ঈমান সংরক্ষণের (হিফযুদ দীন) পাশাপাশি জীবন জীবিকার বৈধ ও ন্যায়ানুগ পথ প্রসারিত হয়। বিভিন্ন ইসলামী ব্যাংক হজ্জ আমানত, মোহর আমানত, ক্যাশ ওয়াক্ফ আমানত, বিবাহ আমানত প্রভৃতি বিশেষ কল্যাণকর হিসাব পরিচালনা করেছে।
ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিনিয়োগ কার্যক্রমে মানবকল্যাণ
ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিনিয়োগ কার্যক্রমের মূল বিবেচ্য বিষয় হলো কল্যাণ বৃদ্ধি করা এবং অকল্যাণ দূর করা। ইসলামী ব্যাংকসমূহ সকল মানুষের জরুরিয়াত অর্থাৎ অপরিহার্য প্রয়োজন পূরণকে অগ্রাধিকার দেয়। ধন-সম্পদ শুধুমাত্র ধনীদের মধ্যেই পুঞ্জীভূত না হয়ে তা যেন সার্বজনীন কল্যাণে নিয়োজিত হয় এদিকে খেয়াল রেখে জনগণের কাছ থেকে সম্পদ আহরণ এবং তা সমাজের উৎপাদনক্ষম ব্যাপক উদ্যোগী মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া ইসলামী ব্যাংক সমূহে নীতি ও কৌশল। ইসলামী ব্যাংক সমূহের বিনিয়োগ পদ্ধতি ও বিনিয়োগের খাত শরীয়াতের দৃষ্টিতে বৈধ হওয়া আবশ্যক। আর্থিক বিবেচনায় কোনো ব্যবসা যথেষ্ট লাভজনক হলেও জনস্বার্থের পরিপন্থি বা ক্ষতিকর কোনো পণ্যে ইসলামী ব্যাংক সমূহ বিনিয়োগ করে না। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সামাজিক কল্যাণমূলক খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত হয়। ইসলামী ব্যাংক সমূহ আর্থিক কারবারে অকল্যাণ দূর করার জন্য কাজ করে। ইসলামী ব্যাংকগুলি তাদের বিনিয়োগ কার্যক্রমের মাধ্যমে মানবকল্যাণের উদ্দেশ্য পূরণে বিস্তৃত ক্ষেত্রে কাজ করছে, যার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক নিম্নে আলোচিত হলো।

(১) কর্মসংস্থান সৃষ্টি: কর্মসংস্থান সৃষ্টি শরীয়াতের উদ্দেশ্য হিফযুন নাফস, হিফযুন-নাসল ও হিফযুল আকল বাস্তবায়নের সাথে যুক্ত। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগ, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন, শিক্ষা বৃত্তি প্রদান, শিক্ষার্থীদের ইনটার্নশিপ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ প্রভৃতি কার্যক্রম বাস্তবায়নে এই ব্যাংকগুলি কাজ করছে। নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষে ইসলামী ব্যাংকগুলির অর্থায়নে শিল্প কারখানা, এস.এম.ই ও গ্রামীণ প্রকল্পসমূহে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অসংখ্য লোকের নিরন্তর কর্মসংস্থান হচ্ছে।

(২) আবাসনে বিনিয়োগ: সীমিত আয়ের মানুষের গৃহায়ণে ইসলামী ব্যাংক সমূহের আবাসন প্রকল্প মাকাসিদুশ শরীয়ার অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনের সব কটি দিক সংরক্ষণের সাথে যুক্ত। দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর আবাসন সমস্যার সমাধানে ইসলামী ব্যাংকগুলি গৃহায়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করছে।

(৩) নারীর কল্যাণ ও ক্ষমতায়ন: সমাজের সামগ্রিক কল্যাণ বেগবান করতে নারীকে শিক্ষিত, কর্মক্ষম, স্বাবলম্বী ও যোগ্য করে তোলা মাকাসিদুশ শরীয়ার জরুরিয়াতের সব কটি স্তর ও ভাগকে শামিল করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لِّلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبُواْ وَلِلنِّسَاء نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبْنَ        
পুরুষ যা উপার্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ এবং নারী যা উপার্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ(আল-কুরআন, ৪:৩২) সেবা, শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্যে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ইসলামী ব্যাংক সমূহ নারীদের জন্য বিভিন্ন খাতে বিশেষ বিনিয়োগ সুবিধা দিচ্ছে। মুলধনের নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত জামানতবিহীন বিনিয়োগের ব্যবস্থা করেছে।

(৪) জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন: ইসলামী ব্যাংক সমূহ গৃহসামগ্রী বিনিয়োগ প্রকল্প, আবাসন বিনিয়োগ প্রকল্প, ডাক্তার বিনিয়োগ প্রকল্প, পরিবহণ বিনিয়োগ প্রকল্প, গাড়ি বিনিয়োগ প্রকল্প, পল্লী গৃহনির্মাণ বিনিয়োগ প্রকল্প, বিবাহ বিনিয়োগ প্রকল্প ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষের জীবন মানের উন্নয়নে শরিক হচ্ছে।

(৫) স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ: স্বাস্থ্য সুরক্ষা হিফযুন নাফসঅর্থাৎ জীবনের সুরক্ষার অন্তর্ভুক্ত। হিফযুদ-দীন অর্থাৎ দীনের সুরক্ষার সাথেও এর সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। ইসলামী ব্যাংকগুলি স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে কাজ করছে। বিভিন্ন ইসলামী ব্যাংকের এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কর্মসূচী রয়েছে যা মানব কল্যাণের জন্য সহায়ক।

(৬) মানবসম্পদ উন্নয়ন: পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও সততা সত্যনিষ্ঠার গুণাবলীতে সমৃদ্ধ করে মানুষকে কল্যাণকারিতার সামর্থ্য সম্পন্ন দক্ষ ও যোগ্য করা শরীয়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। ইসলামে ব্যক্তির সকল বৈধ কাজই কল্যাণ সাধন ও অকল্যাণ দূর করার সাথে যুক্ত এবং তা ইবাদত হিসেবে গণ্য। আর সেইসব কাজ ভালোভাবে করার যোগ্যতা অর্জন সংশ্লিষ্টদের জন্য ফরয। ড. উমর চাপড়ার মতে, মানব সম্পদের উন্নয়ন মাকাসিদুশ শরীয়াতের মৌলিক বিষয় যা জরুরিয়াতের পাঁচটি বিষয়েরই অন্তর্ভুক্ত। ইসলামী ব্যাংকগুলি তাদের বিনিয়োগ ও সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক সকল কাজের দ্বারা মানব সম্পদ ও মানব উন্নয়নে অবদান রাখছে। (ড. এম. উমর চাপড়া, ইসলাম এ- দ্যা ইকোনোমিক চ্যালেঞ্জ, ল-ন: ইসলামিক ফাউ-েশন, ১৯৯৫ খ্রি. পৃ. ৭)
(৭) পরিবেশ সংরক্ষণ ও সুবজ ব্যাংকিং: পরিবেশ সংরক্ষণ ও সবুজায়ন শরীয়াতের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিবেশ সুরক্ষা ইসলামী ব্যাংকগুলির নৈতিক বাধ্যবাধকতা। বিভিন্ন ইসলামী ব্যাংক গ্রীণ ব্যাংকিং কার্যক্রমের আওতায় জ্বালানী সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, সোলার প্যানেল ব্যবহার, অভ্যন্তরীণ অনলাইনভিত্তিক যোগাযোগ নিশ্চিত করছে এবং কাগজবিহীন ব্যাংকিং চালুর দিকে ধাপে ধাপে অগ্রসর হচ্ছে।

(৮) সামাজিক দায়বদ্ধতা: মানব কল্যাণের নীতি অনুযায়ী মানুষকে দরদি ও পরস্পর কল্যাণকামী হতে হবে। দরদি মানুষ গঠন এবং দরদি মানুষদের সমন্বয়ে দরদি প্রতিষ্ঠান ও দরদি সমাজ প্রতিষ্ঠা শরীয়াতের লক্ষ্য। পারস্পরিক দায়বোধ ও দরদি মনোভাব বিকশিত করে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইসলামী ব্যাংকগুলি সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করছে। সেই বিবেচনায় ইসলামী ব্যাংক সমূহের সকল কার্যক্রমই সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতাভুক্ত। ইসলামী ব্যাংক সমূহের জমা ও বিনিয়োগের সকল সেবা সামাজিক দায়বদ্ধতার অঙ্গীকারের সাথে যুক্ত। তদুপরি স্বাভাবিক ব্যাংকিং সেবা কার্যক্রমের বাইরে থেকে যাওয়া বিপুল অভাব ও বঞ্চিত মানুষের জীবন মানের উন্নয়নে কাজ করা ইসলামী ব্যাংক সমূহের নৈতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। 

মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদা পূরণে বঞ্চিত ও অভাব এবং কষ্টে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামী ব্যাংকসমূহের অত্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব। এই লক্ষে ইসলামী ব্যাংকসমূহ স্বাভাবিক লেনদেনের বাইরে জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন, সৌন্দর্যবৃদ্ধি, আর্সেনিকমুক্ত পানি প্রকল্প, ফর্মালিনমুক্ত খাদ্য দ্রব্য নিশ্চিতকরণ সহায়তা ইত্যাদি কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে। বন্যাদুর্গত, মঙ্গাপীড়িত, শীতার্ত এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য ইসলামী ব্যাংকসমূহ সব সময় ত্রাণ সহায়তা নিয়ে পাশে দাঁড়ায়। ব্যাংকিং সেক্টরে জনকল্যাণের ধারণা সৃষ্টি ও বেগবান করতে ইসলামী ব্যাংকগুলি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করছে। শিক্ষা অধিকার সংরক্ষণ বা হিফযুল আকল (মেধা সংরক্ষণ) নিশ্চিত করতে নারী-পুরুষের জন্য অত্যাবশ্যকীয় জ্ঞানার্জনের কাজ করছে। মেধাবী অতিদরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন মেয়াদী শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করা ছাড়াও বিভিন্ন ইসলামী ব্যাংক প্রি স্কুল, মক্তব, মাদরাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট, ভোকেশনাল ট্রেনিং সেণ্টার, পাঠাগার ইত্যাদি পরিচালনা করছে।

শেষ কথা
ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা গবেষণা, সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার নানা পর্যায় পেরিয়ে প্রয়োগিক সফলতা অর্জন করেছে। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তি ও নৈতিক মানের গভীরতা এ ব্যবস্থাকে আগামী বিশ্বের মূল ধারার নিরাপদ আর্থিক মডেল হিসেবে তুলে ধরবে, এ আশাবাদ ইতিমধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে। এ লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংকগুলো স্বাভাবিক লেনদেনের বাইরে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন, সৌন্দর্য বৃদ্ধিসহ আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে কল্যাণমুখী ভূমিকার মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত করেছে। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা আর্থিক খাতে যে কল্যাণমুখী ধারা সৃষ্টি করেছে সেই ধারা বেগবান করার জন্য আইনী সুবিধা, কাঠামোগত সংস্কার ও জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এজন্য নীতিনির্ধারণী উদ্যোগ ও নানাবিধ প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা ও প্রচার-প্রণোদনামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে পরিকল্পিত ও সমন্বিত কার্যক্রম অব্যাহত রাখার মাধ্যমে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা তার সাফল্যের ধারা অব্যাহত রেখে কল্যাণমুখী ব্যাংকিং-এ আপন অবদান আরো প্রসারিত করতে পারবে।
 
লেখকঃ ফজলে এলাহী মামুন
পিএইচডি গবেষক  ও বিভাগীয় প্রধান,(ভারপ্রাপ্ত)
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ ,
লিডিং ইউনিভার্সিটি, সিলেট।
মোবাইল: ০১৭১২১৫৩৯০৫
Email felahimamun@gmail.com


শেয়ার করুন

Author:

0 coment rios:

You can comment here