Wednesday, June 24, 2020

সেরোটনিন ভালোবাসা

 

।। বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল।।

ভালোবাসা মানে সম্পর্ক, মানুষে মানুষে বিশ্বাসের ভিত্তি। ভালোবাসার অনেক রূপ। যেমন ভাইবোনের ভালোবাসা, বাবা-মায়ের ভালোবাসা। পরিবারে একটা পশুর প্রতিও ভালোবাসা হতে পারে। যেমন অনেকে কুকুর পোষে, বিড়াল পোষে, অ্যাকুরিয়ামে মাছ রাখে, পাখিকে কথা বলতে শেখায়। সবকিছুই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। কেউ কেউ ভালোবাসা থেকে গাছ লাগায়, গাছের পরিচর্যা করে। মানুষের প্রতি গাছের ভালোবাসা আছে কিনা জানি না। হয়তো আছে। একটার পাশে গিয়ে আপনি পরিচর্যা করছেন, খোঁজ নিচ্ছেন দেখবেন সেটি তাড়াতাড়ি বড় হয়ে উঠছে। অন্যটির কোনো খোঁজ নেননি। তাই সে বেড়ে উঠছে না। এটা কিন্তু পরীক্ষিত। এর থেকেই বোঝা যায় গাছেরও অনুভূতি আছে। ভালোবাসা শুধু নর-নারীর প্রেমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের মধ্যেই ভালোবাসার প্রকাশ ঘটে। একজন রাজনীতিবিদকে মানুষ ভালোবাসে। তাকে হয়তো সামনাসামনি কোনোদিন দেখেওনি। তবুও ভালোবাসে। কেন? শ্রদ্ধাবোধ থেকে! একেকজনের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ তো একেক রকম। কারোটা সফট। কারো বেলায় খুবই অ্যাংরি। কারোটা কখনও কখনও স্বেচ্ছাচারিতার পর্যায়েও পড়ে। সে অধিকার খাটায়। ভালোবাসার ঘনত্ব বেশি হলেই সেটাকে প্রেম বলা যায়। উদাহরণ দিয়ে বলি। একটি মেয়েকে আমার ভালো লাগে, তাকে ভালোবাসি। এই অনুভূতি যখন গাঢ় হয় তখন সেটাকে প্রেম বলা যেতে পারে।

জীবনের বিভিন্ন সময় আমাদেরকে নানা ঘটনায় বিশেষ কিছু অনুভূতি অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। কেউ যখন ভালোবাসিকথাটা বলেন তখন এক অদ্ভুত অনুভূতি জাগে মনে। যিনি বলছেন তিনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ তাতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু তুলনামূলক এই অনুভূতি সার্বজনীন। এমনই কিছু দারুণ অনুভূতির কথা সবার সাথে শেয়ার করছি। খুব তুচ্ছ কারণে যে কারো প্রতি ভালো লাগা তৈরি হতে পারে। কোনো মেয়ের ভুবন ভুলানো হাসি দেখে এক মুহূর্তেই তাকে ভালো লেগে যেতে পারে। কিংবা রাস্তায় চলতে ফিরতে সুন্দরী কোনো মেয়েকে এক পলক দেখেই যেকোনো ছেলের হার্টবিট মিস হয়ে যেতে পারে। অথবা কোনো ছেলে খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলে, কিংবা গিটার বাজিয়ে, গান শুনিয়ে কোনো মেয়েকে মুগ্ধ করে দিতে পারে। আর তাতে ছেলেটার প্রতি মেয়েটার এক ধরনের অনুভূতি তৈরি হয়।

এই অনুভূতিগুলোকে আসলে ভালো লাগা বলে। ভালোবাসা নয়। ভালোবাসা এত সহজে হয় না। একজন মানুষের জন্য ভালোবাসা তৈরি হয় খুব ধীরে ধীরে। চাইলেই যে কাউকে ভালোবাসা যায় না। চাইলেই যে কাউকে ভালোবাসি বলা যায় না। চাইলেই সব ছেড়ে ছুঁড়ে কেউ একজনের হাত ধরে দূরে কোথাও পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে না। চাইলেই কেউ একজনের জন্য পুরো পৃথিবীর বিপক্ষে চলে যাওয়া যায় না। সেই কেউ একজনটা খুব স্পেশাল একজন মানুষ হয়। যাকে শুধু ভালোবাসাই যায়। চোখ বন্ধ করে যার উপর নির্ভর করা যায়। যে অনুভূতি খুব তাড়াতাড়ি তৈরি হয় তা হারিয়েও যায় খুব দ্রুত। অনুভূতি হারিয়ে গেলে সে মানুষটাও কিছু না বলে চুপি চুপি আপনার জীবন থেকে হারিয়ে যায়। তখন বুঝতে হবে আপনার প্রতি তার কখনো ভালোবাসা ছিল না। যা ছিল তার পুরোটাই ছিল ভালো লাগা। কারণ যাকে ভালোবাসা যায় হুট করে রাস্তার মাঝখানে তার হাত ছেড়ে দিয়ে দূরে চলে যাওয়া যায় না। বেশিরভাগ মানুষই ভালো লাগা এবং ভালোবাসার মধ্যে পার্থক্য বের করতে পারে না।

আপনি আদর্শ প্রেমিক বা প্রেমিকা হতে পারেন। কিন্তু ভালোবাসার সুধা পান করে কি মাতালের অনুভূতি পেতে পারেন আপনি? বিজ্ঞানীরা বলছেন, হ্যাঁ, আপনি পারবেন। ভালোবাসার কিছু অদ্ভুত অনুভূতি রয়েছে। এগুলো দেহে-মনে-প্রাণে ছড়িয়ে যাবে। এগুলো তীব্রভাবে অনুভব করে মানুষ। দেখে নিন সেই অনুভূতিগুলো। 

.    ভেসে বেড়ানোর অনুভূতি পাবেন :

নতুন কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে আনন্দে কেন ভাসবেন তার একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে। নিউ ইয়র্কের আলবার্ট আইনস্টাইন কলেজের গবেষকরা প্রেমিক-প্রেমিকাদের মস্তিষ্কের এমআরআই করেন। ভালোবাসার অনুভূতি মস্তিষ্কে তেমনই পরিবর্তন ঘটায় যা কোকেন গ্রহণ করলে হয়। এটি আপনাকে উড়ে বেড়ানোর মতো হালকা করে দেবে।

২.     বধির করে দেবে আপনাকে :

২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে মোটিভেশন অ্যান্ড ইমোশন জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেমে পড়লে কিছু পরিস্থিতিতে মানুষ একেবারে বধিরে পরিণত হয়। তারা একেবারে সাধারণ বিষয় দেখতে বুঝতে পারেন না। নাওয়া-খাওয়া, ঘুম সবকিছু হারাম হয়ে যায়। মোটকথা, এই অনুভূতি মস্তিষ্ককে অনেকটা অকার্যকর করে দেয়।

৩.    মনে হিংসা-ঈর্ষা জন্ম নেয় :

হিংসা ঈর্ষার উদয় হয় ভালোবাসা থেকে। সম্প্রতি পারসোনালিটি অ্যান্ড সোশাল সাইকোলজি বুলেটিন জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নিউরোলজিক্যাল হরমোন নিঃসরণের কারণে মানুষ অনেকটা আগ্রাসী হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে সহানুভূতির আবেগও প্রকাশ পায়। প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে অন্য কারো ভালো সম্পর্ক দেখতে একদমই ভালো লাগে না। এগুলো তারই উদাহরণ।

৪.     আচ্ছন্ন করে রাখে :

সম্পর্কের শুরুতে প্রাথমিক অবস্থায় মনটা অন্যের চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকে। ইতালির ইউনিভার্সিটি অব পিসা-এর গবেষকরা দেখেছেন, ভালোবাসার অমোঘ আবেশ আচ্ছন্নতা ছেয়ে যায় মনে। সদ্য প্রেমে পড়া মানুষদের প্রথম ছয় মাস দেহে সেরোটনিন হরমোনের মাত্রা কম থাকে। এতে করে শুধু একজনের চিন্তাতেই ভরে থাকে মন।

৫.    নিজেকে অপরাজেয় মনে হবে :

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানান, চরম ভালোবাসার অনুভূতি মস্তিষ্কের সেই সব স্থানে ছড়িয়ে পড়ে যেখানে ব্যথানাশক ওষুধ কাজ করে। ভালোবাসার কারণে মানুষের মনের ভয় ব্যথা দূর হয়ে যায়। আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে মানুষ নিজেকে অপ্রতিরোধ্য মনে করে। কাজেই এর ফলে ব্যথাও দূর হয়।

সুন্দরী মেয়েরা পুরুষের হৃদরোগের জন্য দায়ী

গবেষণা বলছে, সুন্দরী মেয়েরা পুরুষের হৃদরোগের জন্য দায়ী। সুন্দরী মেয়েদের সান্নিধ্যে এলে পুরুষের মধ্যে মানসিক চাপ বাড়তে থাকে। এমনকি এই চাপ বাড়ার কারণে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক গবেষণা শেষে এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।

ওই গবেষণায় জানা গেছে, সুন্দরী নারীর পাশে পাঁচ মিনিট বসলেই পুরুষের মধ্যে মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়। যা শরীরে কোর্ট্রিসল নামক বিশেষ হরমোনের প্রবাহ বাড়িয়ে দেয়। আর বিপত্তি সেখানেই। বেশি কোর্ট্রিসলের প্রবাহ হৃদযন্ত্রের ক্ষতি থেকে শুরু করে ডায়াবেটিস এমনকি পুরুষকে নপুংসক পর্যন্ত করে ফেলতে পারে।

গবেষকদের মতে, পুরুষদের মধ্যে যারা নারীদের কাছ থেকে সবসময় দূরে থাকতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য সুন্দরীরা একটু বেশি ক্ষতিকর। ৮৪ জন স্বেচ্ছাসেবী পুরুষের ওপর গবেষণা চালিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে এই তথ্য। কম বয়সী সুন্দরী নারী আশেপাশে দেখলে অধিকাংশ পুরুষ প্রেমের সুযোগ আছে বলে ভাবতে শুরু করেন। খুব কম পুরুষই সুন্দরীদের পাশ কাটিয়ে চলতে পারেন। যার ফলে না চাইতেও পুরুষরা প্রেমে পড়তে বাধ্য।

নারী পুরুষের সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসা

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভালোবাসার সম্পর্ক বোঝাটা বেশ কঠিন। আরো কঠিন যেখানে নারী পুরুষ বিপরীত লিঙ্গ বা সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বোধ বা সাড়া প্রদান করে। এখানে শারীরিক কল্পনা, বিয়ে, যৌনতা, আনন্দ বা তৃপ্তি প্রজনন ইত্যাদি বহুবিধ বিষয় জড়িত। অন্তরঙ্গ সম্পর্কের ক্ষেত্রে যৌন অনুভূতি আকাঙ্ক্ষা থাকে। যৌন অনুভূতি আকাঙ্ক্ষাা মানুষের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু ফ্রয়েড এবং ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের সমর্থকগণ যারা মনে করেন, সব প্রেমের উৎস হচ্ছে কাম তাদের সাথে আলোচনার মিল পাওয়া যাবে না। ভালোবাসা বুঝানোর জন্য হয়তো বাংলা ভাষার আর একটি শব্দ প্রেমব্যবহার করা যেতো। কিন্তু প্রেমশব্দটির সঙ্গে দেশপ্রেম, প্রকৃতি প্রেম, ঈশ্বর প্রেম সবই জড়িয়ে আছে। তাই এখানে ভালোবাসাশব্দই ব্যবহার করা হয়েছে।

ভালোবাসা কী আবেগ না অন্য কিছু

ভালোবাসা প্রায়শ আবেগতাড়িত হয়। কিন্তু এটি অসাধারণ শক্তিশালী কিছু একটা। বিজ্ঞানীরা মুখের অভিব্যক্তি দিয়ে আবেগকে ব্যাখ্যা কারার চেষ্টা করেছেন। সুখ, দুঃখ, বিরক্তি, রাগ, বিস্ময় এবং অন্যান্য মৌলিক আবেগ মুখের ওপর সহজে দেখা যায়। কিন্তু ভালোবাসা একটি উদ্যম (drive) এবং একটি প্রেরণা। এটি মুখের কোনো নির্দিষ্ট অভিব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত নয়। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক রবার্ট প্লুটচিক (Robert Plutchik) তাঁর তত্ত্বে ৮টি প্রাথমিক আবেগের কথা বলছেন। যেমনভয়, রাগ, বিষণ্নতা, আনন্দ, বিতৃষ্ণা বোধ, বিশ্বাস, প্রত্যাশায় সাড়া, বিস্ময়। ৮টি প্রাথমিক আবেগের মধ্যে ভালোবাসার কোনো স্থান নেই। যখন প্রয়োজন আবেগ শুধু তখনই দেখা দেয়। সাধারণভাবে আবেগ পরিবর্তিত হয়। পরিবেশের প্রতিক্রিয়ায় আবেগের পরিবর্তন হয়। আবেগ নিজে বারবার পুনরাবৃত্তি করে কিংবা বহুবার একই তীব্রতা নিয়ে আসে। তখন কিছু ভুলও হয়। কিন্তু প্রকৃত ভালোবাসা এবং সুস্থির প্রতিশ্রুতি সারা জীবন এবং মৃত্যুর পরেও অন্তহীন সময়কাল জুড়ে ফিরে ফিরে আসে। ভালোবাসা শুধু পরিবেশ প্রতিক্রিয়ায় বাড়ে বা কমে না। এটা হাওয়া বদলের মতো করে পরিবর্তিত হয় না। ভালোবাসা শুধু একটি আবেগ নয়; আবেগ যেভাবে আচরণ করে ভালোবাসা তেমনটা করে না। প্রকৃত ভালোবাসার নিজস্ব একটা ধরণ আছে।

ভালোবাসার রকমফের

আসলে ভালোবাসার বিভিন্ন ধরণ বর্ণনা করা বেশ কঠিন। অনেকে ভালোবাসাকে রহস্যময় ভালোবাসা (mystical love) বা বিশুদ্ধ ভালোবাসা (pure love) হিসেবে চিহ্নিত করেন। এটা ভালোবাসার অন্য দুধরনের তুলনায় অনেক দুর্লভ। যেহেতু আত্মপ্রেম (love mode of narcissism) নিজের মধ্যে নিবদ্ধ থাকে এবং অন্যকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে ঈর্ষা (love mode of jealousy) থাকে কিন্তু বিশুদ্ধ ভালোবাসায় কোনো উদ্দেশ্য থাকে না। এটি হঠাৎই আসে এবং সবকিছুর প্রতি এটি উদ্যমের মোহন একটি প্রবাহ। শুধু সে সময় একজন ভালোবাসা অনুভব করে যখন কেউ কারো ভালোবাসায় আচ্ছন্ন হয়। তারপর সমগ্র পৃথিবী একটা জাদুর মতোই বিস্ময়কর জগতে রূপান্তরিত হয়। আবার যখন সে জাদু ঝরে পড়ে, ভালোবাসার সে অনুভূতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং ভালোবাসার মাঝে দেখা যায় ঈর্ষা। কিন্তু কিছুটা যৌক্তিকতা আনার প্রয়োজনে এখানে শুধু রোমান্টিক ভালোবাসাএবং অঙ্গীকারবদ্ধ ভালোবাসা কথা বলতে হচ্ছে।

রোমান্টিক ভালোবাসা

ভালোবাসার বৈশিষ্ট্য, পছন্দের ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার, বাড়তি মনোবল, ছন্দময় মন, সহানুভূতি, কখনো ঘাম ঝরানো, কখনো নিষ্পেষিত হৃদয়, মানসিক নির্ভরতা, যৌন ইচ্ছা অত্যধিক চিন্তা, সংযুক্ত দেহভঙ্গি, লক্ষ্যভিত্তিক আচরণ, তীব্র প্রেরণা, প্রজনন অংশীদারিত্ব বজায় রাখার জন্য আয়োজন ইত্যাদি। স্নায়ুবিজ্ঞানীরা রোমান্টিক ভালোবাসা মগ্ন মানুষের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করেছেন। তাদের মস্তিষ্কের কিছু এলাকা বিচারকের ভূমিকা এবং নিজেকে প্রতিফলিত করে। রোমান্টিক ভালোবাসায় বাইরের পরিস্থিতি এবং অন্যান্য ব্যক্তি সম্পর্কে রায় নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং অন্যান্য বোধ হারিয়ে যায়। আরেকটি দৃষ্টিকোণ থেকে ধারণা করা হয় ভালোবাসা শুধু মনের মধ্যের মোহাচ্ছন্নতা বা বিভ্রম থেকে আসে। কিছু সমাজবিজ্ঞানী কীভাবে রোমান্টিক ভালোবাসা মিডিয়াতে চিত্রিত এবং একটি ফ্যান্টাসি তৈরি করার মাধ্যমে বরাবর দেখানো হয় তা বিশ্লেষণ করেছেন। 

ভালোবাসায় একটি ঐন্দ্রজালিক অন্যান্য সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। যখন বাস্তবতার সঙ্গে মেলানো হয়, তখন সেটি খুঁজে পাওয়া যায় না। বিশ্লেষণমুখী মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই ভালোবাসা নিজের খুব ভেতরের প্রধান একটি অংশের প্রতিফলন সাধারণত নতুন কারো সঙ্গে পরিচিত হলে এবং ঝলমল করে দ্যুতি ছড়ালে’, আমাদের কল্পনা থেকে সব বিস্ময়কর বিষয় সেখানে যুক্ত করি। এটা মূলত বাস্তবতাকে অনেক আড়ম্বরপূর্ণভাবে উপস্থাপন করা। অনেকটা দেবদেবীর মতো অবস্থা। যেন একদম নিখুঁতসে। যখন তার সম্পর্কে আমাদের কাছে খুব সামান্য তথ্য থাকে তখন আমরা নিজেদের কল্পনা এবং বিশ্বাসের মাধ্যমে তা পূরণ করে থাকি। রোমান্টিক ভালোবাসায় বাস্তব মানুষ হিসেবে আমরা অনেক সময় সঙ্গীদের সঙ্গে সংযুক্ত হই।

অঙ্গীকারবদ্ধ ভালোবাসা :

ধরনের ভালোবাসার গল্প অনেক ভিন্ন। এটা ঝলমল করে না। অঙ্গীকারবদ্ধ ভালোবাসা স্বাভাবিক জীবন একসঙ্গে ভাগাভাগি করে। এটা সমর্থন, অনুরক্ত, সদয় দেখাশোনা, প্রতিশ্রুতি, দায়িত্বশীলতা এবং অনুগত থাকে। দীর্ঘমেয়াদী দম্পতিদের জন্য এটি স্বাস্থ্যকর এবং চিন্তা করা যেতে পারে যে প্রেমে নিমগ্ন মনোবিজ্ঞানের বিখ্যাত লেখক রবার্ট জনসন একে বলেছেন রোমাঞ্চকর যবের তৈরি খাবার’ (stirring the oatmeal) আর বর্ণনা করেছেন-আটপৌরে সাধারণ জীবনে একসঙ্গে চলার ইচ্ছা, জীবনধারণের জন্য রোজগার, বাজেটের মধ্যে জীবনযাপন, আবর্জনা ফেলার ব্যবস্থা, মাঝরাতে শিশুকে খাওয়ানো। দুমুঠো খাবার থেকে শুরু করে চিন্তা-চেতনায় সম্পর্কিত হওয়া। সাধারণ জিনিসের মাঝেও সৌন্দর্য বিদ্যমান। চিরকাল শুধু মহাকাব্যিক নাটকের দাবি নয়, একটি বিনোদন কিংবা সবকিছুতেই অসাধারণ গভীরতার দাবি নয়। এটা একটি পবিত্র আবিষ্কারের প্রতিনিধিত্ব করে যা বিনম্র এবং সাধারণ। অঙ্গীকারবদ্ধ ভালোবাসা রাতারাতি ঘটে না। ভালোবাসায় সময় লাগে। অঙ্গীকারবদ্ধ ভালোবাসা একগামী হতে সাহায্য করে। অঙ্গীকারবদ্ধ ভালোবাসায় দম্পতিরা একসঙ্গে থাকার পুরস্কারের উপলব্ধি পেতে পারে। অনেকেই মনে করেন ধরনের ভালোবাসা ভিত্তি হলো আকর্ষণ। কিন্তু সুস্থ সম্পর্কের মাঝে অঙ্গীকারবিষয়ক এক গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়েছে ভালোবাসায় একে অপরের প্রতি অঙ্গীকারের জন্যও প্রয়োজন নিয়মিত সমর্থন, মমত্ব এবং বন্ধুত্ব। 

ভালোবাসার অন্তহীন পথ পরিক্রমা :

ভালোবাসা রোমান্টিকনাকি অঙ্গীকারবদ্ধ নিয়ে রয়েছে বিস্তর মতবিরোধ, তর্ক-বিতর্ক। ভালোবাসার হাসি-কান্না, ভালোবাসার আনন্দ-বিষাদ, ভালোবাসার বর্তমান-ভবিষ্যতের সব পাজল টুকরোগুলো একসঙ্গে করা খুব কঠিন। প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়। যৌন আকাক্সক্ষা, সংযুক্তি এবং ভালোবাসার মধ্যে যেমন পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে তেমনি রয়েছে বিস্তর ফরাক। স্থান, কাল, পাত্র ভেদে বিরাট তারতম্য। ক্ষমতার তারতম্যের কারণে নারী-পুরুষের ভালোবাসার মধ্যে অনেক পার্থক্য তৈরি হয়। এমনকি সম্পর্ক যুক্ত সঙ্গীদের মধ্যেও ক্ষমতার তারতম্য হয়। বিয়ের মাধ্যমে নারী-পুরুষ বা সঙ্গীদের মধ্যে যে সম্পর্ক তৈরি হয় তা বৈষম্যমূলক। বিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্কের মধ্যে অঙ্গীকারবদ্ধতাতৈরি করে না। কখনো কখনো বৈষম্যমূলক অবস্থাটা বুঝতে না পারার কারণে ভালোবাসা নিয়ে মিশ্র অনুভূতি এবং বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কেউ কেউ বলবেন অঙ্গীকারবদ্ধতা খুব বিরক্তিকর শোনাচ্ছে!হ্যাঁ, আমাদের সম্পর্ক যদি ভালোবাসার চেয়ে সবসময় উত্তেজনা দেখানোর মধ্যে বিকাশ লাভ করে তাহলে অবশ্যই এটা বিরক্তিকর। আবার কেউ বলেন, যখন রোমান্টিক ভালোবাসার আগুন বিবর্ণ হয়ে যায় তখন অঙ্গীকারবদ্ধ ভালোবাসা শুরু হয়। রোমান্টিকবনাম অঙ্গীকারবদ্ধভালোবাসা নিয়ে বিতর্কের সহজ কোনো সমাধান নেই। অনেক মানুষ উদ্বিগ্ন হয় যখন তারা রোমান্টিক ভালোবাসা থেকে অঙ্গীকারবদ্ধতার দিকে যায়। তারা মনে করে সম্পর্কের মধ্যে কিছুটা ভুলঅথবা তারা ভালোবাসা থেকে দূরে কিন্তু সম্পর্ক অঙ্গীকারবদ্ধ হলেও ভালোবাসা সবসময় সহজ নয়। সম্পর্কের মাঝেও উত্থান পতন থাকে। অনেক মনোবিজ্ঞানী বলছেন, মানুষের একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক এবং একটি উত্তেজনাপূর্ণ জীবন একসঙ্গে থাকতে পারে। তারা পরামর্শ দিয়েছেন দীর্ঘকাল ধরে সম্পর্কের মাঝে খুঁটো-খুঁটির চেয়ে দুজনে মিলে ছুটিতে যেতে, কিছু কাজ গুটিয়ে নিতে, ভালোবাসার মধ্যে নতুন কিছু অন্বেষণ করতে। একটি অঙ্গীকারবদ্ধ সম্পর্কেও রোমান্সের ভালো এবং মন্দ দিককে অতিক্রম করতে হয়। পারস্পরিক মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে যেমন রোমান্টিকতা থাকে তেমনি অঙ্গীকারবদ্ধতা তৈরি হয়। তখন দুজনে একসঙ্গে তাদের পছন্দমত একটি জীবন অতিবাহিত করতে পারে।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক, প্রকাশক ও সংগঠক



শেয়ার করুন

Author:

0 coment rios:

You can comment here