Friday, August 7, 2020

ম্যাজিক পার্সোনালিটি

 

।। বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল।।

আমাদের সকলের জীবনেই অনুসরণীয় বা অনুকরণীয় কেউ না কেউ আছেন। যার ব্যক্তিত্ত¡, আচরণ, কথাবার্তা আমাদের মনে গভীরভাবে ছাপ ফেলে যায়। কিন্তু কখনো চিন্তা করে দেখেছেন কি, তাঁরা কিভাবে সবার প্রিয় হয়ে উঠলেন? ব্যক্তিত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রেই। এটা আমরা কেউ অনুভব করতে পারি, কেউ পারি না। কেউ গুরুত্ব দেই, কেউ দেই না। তাই আজকাল এর বড়ই অভাব পড়েছে।

আমরা অনেকেই হয়ত জানিনা, ব্যক্তিত্ব কি? এর মূল্যই-বা কতটুকু একজন ব্যক্তির জীবনে। এর মূল্যায়ন করতে পারি না বলেই নিজেদের ব্যক্তিত্ব গঠন করতে পারি না। এই ব্যক্তিত্বের অভাবে অনেকে প্রতিভা থাকা সত্তে¡ও জীবনে সাফল্য অর্জন করতে পারে না। ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন ব্যক্তিরা ঠিকই জীবনে সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হন। একজন হীন মনের ব্যক্তি পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে কিছুই দিতে পারে না। অপরদিকে একজন ব্যক্তিত্ববান ব্যক্তির পক্ষে অনেক ভালো কিছু করা সম্ভব। তাই, কোনোভাবে এই ব্যক্তিত্ব বিষয়টাকে আমাদের এড়িয়ে চলা উচিত নয়। ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নৈতিকতারও একটা সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই আসুন আমরা ব্যক্তির জীবনের সফলতার জন্য, নিজের সঠিক মূল্যায়নের জন্য ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে একটু সচেতন হতে চেষ্টা করি। তবে প্রথমেই মনে রাখবেন, সবার আকাক্সিক্ষত হতে চাইলে আপনাকে হতে হবে একজন ভালো মানুষ। তারপর আসবে অন্য সব দিক।

লক্ষ্য করে দেখুন, আমাদের  জীবনে যারা অনুসরণীয় বা অনুকরণীয় তাঁরা কেউ কিন্তু নিজের সুন্দর চেহারার জন্য আমাদের কাছে প্রিয় নন, বরং এই প্রিয় হবার পেছনে আছে গুরুত্বপূর্ণ একটা কারণ। তাঁরা আমাদের কাছে প্রিয় হবার কারণ হলো তাদের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারলে তাঁদের মতন আপনিও হয়ে উঠতে পারেন সবার আকাক্সিক্ষত।

অনেকেই হয়ত ভেবে থাকেন কিভাবে ব্যক্তিত্ববান হওয়া যায়। আগেই বলা হয়েছে, ব্যক্তিত্ব এমন কিছু না যা কারও কাছ থেকে চেয়ে নেওয়া যায়। মূলত নিজে নিজেই ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটানো যায় না। এটা অর্জন করতে হলে আপনাকে লোকচরিত্র অধ্যয়ন করতে হবে। সবার সঙ্গে মিশতে হবে। ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও ব্যক্তিত্ব সচেতন হওয়া যায়। লোক সমাজে মিশতে গেলে আপনার কাছে ভালো-মন্দ দিকগুলো ধরা পড়বে। তখন আপনি ভালোমন্দ যাচাই করে আপনার ব্যক্তিত্বকে প্রখর করতে পারবেন। আমরা সবাই ব্যক্তিত্ববান হতে চাই। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে একদিনে যেমন কিছু করা যায় না তেমনি সফল ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হলে আপনাকে দিন, মাস, বছর অপেক্ষা করতে হবে। কিভাবে সমাজের, রাষ্ট্রের, বিশ্বের সফল ব্যক্তিরা চলাফেরা করেন, কিভাবে তারা কথাবার্তা বলেন, সেগুলো পরম নিষ্ঠার সঙ্গে দেখতে হবে। এবং সেগুলো নিজের মাঝে আয়ত্ত করতে হবে। সবজায়গায় গ্রহণযোগ্যতা নিজের মাঝে আয়ত্ত করতে হবে। মন্দ বিষয়গুলো বুঝে তা পরিহার করতে হবে। কারণ, আপনাকে বুঝতে হবে ব্যক্তিত্বের গুরুত্ব সব জায়গায় অপরিসীম। তাই নিজের ব্যক্তিত্বের প্রতি গুরুত্ব দিন। নিজের স্বার্থের জন্যই এটা আমাদের করা উচিত।

ব্যক্তিত্ব প্রকাশে ব্যবহার

দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য রূপের কোনো বিকল্প নেই। অপরদিকে এই আকর্ষণের স্থায়িত্ব দীর্ঘ করবে আপনার সুন্দর ব্যবহার। ব্যক্তিত্ব কাউকে অন্যদের কাছে উপস্থাপন করে আলাদাভাবে। একজন ব্যক্তিত্ববান মানুষ যেমন সকলের পছন্দনীয় তেমনি অনুকরণীয়। প্রায় সবাই নিজেকে ব্যক্তিত্ববান হিসেবে গড়ে তোলার ইচ্ছা পোষণ করে। ছাত্রজীবন থেকেই নিজেকে ব্যক্তিত্ববান হিসেবে গড়ে তোলা উচিত। এখন জেনে নিন কিছু পরামর্শ যা আপনাকে পরিণত ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে সাহায্য করবে

পরিচিত হওয়ার সময় বিনয়ী হোন

নতুন কারো সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ক্ষেত্রে বিনয়ী ভাব প্রকাশ করুন এবং হাসিমুখে থাকুন। কথা বলার সময় চোখের দিকে তাকিয়ে বলুন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, তার নাম মনে রাখার চেষ্টা করুন।

অপরকে সাহায্য করুন

ছোটখাটো কিছু ভদ্রতা এবং সাহায্য অন্যের দৃষ্টিতে আপনাকে অনেক উঁচুতে তুলে দিতে পারে। কারো জন্য দরজা খুলে দেওয়া, হাত থেকে ভারী বস্তু নিয়ে নিজে বহন করা ইত্যাদি উপায়ে মানুষকে সাহায্য করুন। এতে সবার মনে আপনার মনে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হবে।

অপরকে সম্মান দিন

ছোট বড় বা পদ পার্থক্য যাই থাকুক না কেন, অপরকে সম্মান দিয়ে কথা বলুন। ঝাড়ি দিয়ে কাজ আদায় করার চেয়ে, একটু সুন্দর ও সম্মান দিয়ে কথা বলে সহজেই হাসিল করুন কাজ। অন্যকে সম্মান দিলে, নিজেও সম্মানিত হবেন।

সমালোচনা করবেন না

কারো অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে সমালোচনা করার মানসিকতা পরিত্যাগ করুন। যার সমালোচনা করছেন তার কাছে তো বটেই, যাদের কাছে গিয়ে সমালোচনা করছেন তাদের চোখেও আপনাকে সস্তা করে তোলে এই অভ্যাসটি। কোনো ব্যক্তির আচরণ আপনার অপছন্দ হলে বা আপনাকে আঘাত দিয়ে থাকলে তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করুন, সবার সামনে নয়।

নেতিবাচক ধারণা ত্যাগ করুন

অনাকাক্সিক্ষত মুহূর্তে নিজের বিবেককে কাজে লাগান এবং পজিটিভ চিন্তা করুন। এতে আপনার গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।

শালীনতা বজায় রাখুন

পোশাকের মাধ্যমে আপনি নিজেকে অনেক ভালো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবেন। আপনি যদি পোশাকে শালীনতা বজায় না রাখেন তাহলে মানুষ আপনাকে ভালো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ ভাববেন না।

আসুন নিজের ব্যক্তিত্বকে বিকাশ করতে কি করা যেতে পারে তা জেনে নেই-

১.       নিজের একটি সুন্দর ও পৃথক ব্যক্তিত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করুন। কারো অনুকরণ করে নয়, বরং সবাই যেন আপনাকে অনুসরণ করতে চায় সেভাবেই নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করুন। আর এই জন্য, আপনি যেমন আছেন তেমন থাকারই চেষ্টা করুন। জোর করে কোনো কিছু নিজের ওপরে আরোপ করতে যাবেন না।

২.      যখন যে কাজটি করছেন তখন শুধু সেই কাজেই মনোযোগ দিন। অর্থাৎ কর্মক্ষেত্রে যখন আছেন তখন সেখানেই মনোযোগ ধরে রাখুন, আবার যখন পরিবার বা বন্ধুবান্ধবের সাথে আছেন তখন তাদের সাথেই সময় কাটান। এভাবে আপনি নিজের শতভাগ ব্যবহার করতে পারবেন।

৩.      মানুষ হিসেবে যে সম্মানটা আপনি অন্যদের কাছ হতে আশা করেন, ঠিক তেমনই অন্যদেরকে সম্মান দিতে শিখুন। বড়দের শ্রদ্ধা আর ছোটদের করুন স্নেহ।

৪.      আপনার চাইতে নিচের পদের লোকদের সঙ্গে যথাযথ বিনয়ের সাথেই কথা বলুন। একজন ব্যক্তি রিকশা চালায় বলেই তাকে তুই করে বলতে হবে বা বাসার কাজের মানুষটি আপনার থেকে বয়সে বড় হলেও কাজের মানুষ হয়েছেন বিধায় তাঁকে অপমান করে কথা বলার অধিকার আপনি রাখেন না। যিনি নিজের চাইতে ছোট পদের মানুষদের সাথে ভালো আচরণ করতে পারেন না, তিনি কোনোদিনই একজন ভালোমানুষ হতে পারেন না।

৫.      অন্য ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে দৃঢ়ভাবে বিরত থাকুন। মনে রাখবেন, আপনার নিজেরও ব্যক্তিগত একটি জীবন আছে যেখানে অন্যলোকের হস্তক্ষেপ আপনার পছন্দ হবে না। যদি তাই হয় তবে অন্যের ব্যাপারে কেন নাক গলাতে যাবেন?

৬.     সব সময় ফরমালবা খুব দামি পোশাক পরে সেজেগুজে থাকলেই স্মার্টনেস আসবে তা নয়, তবে একদম অপরিষ্কার থাকলেও তো চলবে না। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকার চেষ্টা করুন। আপনার শরীরের দুর্গন্ধে যদি অন্য কারো সমস্যা হয় তবে তা তো আপনাকে স্মার্ট হিসেবে তুলে ধরবে না। পোশাক যেমনি হোক, তা যেন পরিপাটি আর পরিছন্ন হয় সেটাই খেয়াল রাখবেন।

৭.      অপ্রয়োজনীয় ও ফালতু কথা বলবেন না এবং অন্যদেরকেও বলতে উৎসাহিত করবেন না। বেশি কথা বলাই স্মার্টনেস এর লক্ষণ নয়, বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কিন্তু জোরদার কথা বলুন। অপ্রাসঙ্গিক কথা বা মন্তব্য জীবনের সব ক্ষেত্রেই আপনার ব্যক্তিত্বকে খাটো করে। এমনকি লক্ষ্য করে দেখবেন যে, একটি অপ্রাসঙ্গিক ফেসবুক কমেন্ট পর্যন্ত আপনাকে কতটা খেলো করে ফেলে অন্যের চোখে।

৮.      সবকিছুই করলেন পরামর্শ মতন, কিন্তু দিন শেষে যদি আপনার মাঝে নিজেকে নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়, তাহলে আর নিজেকে স্মার্ট হিসেবে তৈরি করবেন কিভাবে? তাই অতি অবশ্যই নিজের উপরে বিশ্বাস আনুন। আপনি আত্মবিশ্বাসী না হলে তো অন্যরাও তো আপনার প্রতি আস্থা আনতে পারবে না, তাই না? আত্মবিশ্বাসী মানুষের আলাদাই একটি ব্যক্তিত্বের ছটা থাকে।

৯.      নিজেকে ব্যক্তিত্ববান দেখাতে গিয়ে আবার অতিরিক্ত ভাব বা মুড দেখাতে যাবেন না যেন। অতিরিক্ত ভাব দেখালেই কেউ স্মার্ট হয়ে যায় না, বরং স্মার্টনেস কমিয়েই দেয় আপনার আলগা এই ভাব।

১০.    রপ্ত করুন সুন্দর করে কথা বলার অভ্যাস। আপনি সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বললে যে কেউ আপনার কথার মূল্য দিতে বাধ্য। সেই সঙ্গে ঘরের বাইরে এড়িয়ে চলুন আঞ্চলিকতাকে। কথা বলার সময় সরল সহজভাবেই কথা বলুন, বাঁকা কথা বা অতিরিক্ত জটিল কথা বলে নিজেকে স্মার্ট প্রমাণ করতে চাইলে বোকা বনে যাবার সম্ভাবনাই বেশি। আর অবশ্যই সকলকে সম্মান দিয়ে কথা বলুন।

১১.     কথা বলার সময় আই কন্টাক্ট করার চেষ্টা করবেন এবং হাসি মুখে কথা বলার চেষ্টা করবেন। এতে আপনার কথার প্রতি আপনার আস্থা প্রকাশ পাবে। এবং সামনের মানুষটিও আপনার ওপরে আস্থা খুঁজে পাবে।

১২.    কথা বলার সময় সুন্দর সুন্দর শব্দ চয়ন করুন, এছাড়াও নিজের মাতৃভাষাকে ভালোভাবে জেনে শব্দভাÐারকে সমৃদ্ধ করুন। অন্য ভাষায় কথা বলার আগে নিজের ভাষা সম্পর্কে জানুন। যে ব্যক্তি নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানেন না, তিনি কোনোদিনই একজন ব্যক্তিত্ববান মানুষ হতে পারেন না।

১৩.    অপরের কৃতিত্বের জন্য প্রশংসা করতে শিখুন। তাদের অর্জনকে হিংসা করতে যাবেন না। অন্যের কৃতিত্বকে স্বীকৃতি দিতে পারে কেবলই একজন সঠিক ব্যক্তিত্ববান মানুষ।

এই তো রইলো পরামর্শ, তবে পালন করার দায়িত্বটি কিন্তু আপনার। একটু চেষ্টা করেই দেখুন, খুব কঠিন কিছু নয়। এই ব্যাপারগুলোই আপনাকে করে তুলবে আরও আকর্ষণীয় ও ব্যক্তিত্ববান একজন মানুষ।

যেহেতু সব ক্ষেত্রের ব্যক্তিত্বের একটা মূল্যায়ন রয়েছে। এবং এর ওপর আমাদের ব্যক্তিগত সাফল্য নির্ভর করে। তাই নিজের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটাতে চেষ্টা করুন। আপনি যদি পরিবার সমাজে, রাষ্ট্রের একজন হিসেবে তুলে ধরতে চান তাহলে আপনার ব্যক্তিত্ব বিকাশের বিকল্প নেই। সব শেষে একটা কথাই বলতে চাই, আসুন আমরা সবাই সর্বক্ষেত্রে নিজেকে একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ববান মানুষ হিসেবে তুলে ধরতে চেষ্টা করি। কারণ এতে আমাদের জীবনের সাফল্য নিহিত রয়েছে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, প্রকাশক ও সংগঠক


শেয়ার করুন

Author:

0 coment rios:

You can comment here