Wednesday, February 17, 2021

সত্যের সন্ধানে, পর্ব-২২ ইসলামের খলিফাগণের সংক্ষিপ্ত জীবনী হযরত আবু বকর (রা.)


 সত্যের সন্ধানে, পর্ব-২২ ইসলামের খলিফাগণের সংক্ষিপ্ত জীবনী

হযরত আবু বকর (রা.)

ভূমিকা

নবীদের পর উম্মতকুলে সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা সর্বোচ্চ বলেই বিবেচিত হয়। আর সেই সাহাবিদের মধ্যে যাঁর নাম অগ্রগণ্য, তিনি হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ)। তিনি মক্কার বিখ্যাত কোরাইশ বংশের বনু তাইম গোত্রে ৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাল্য নাম আবদুল্লাহ ও ডাকনাম আবু বকর। সিদ্দিক হচ্ছে তাঁর উপাধি। মিরাজের ঘটনাকে সর্বপ্রথম মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেছিলেন বলেই রাসুল (সাঃ) তাঁকে এই উপাধিতে ভূষিত করেন।

ইসলামের প্রথম খলিফা এবং ইসলাম গ্রহণকারী তৃতীয় ব্যক্তি। সুন্নী বিশ্বাসমতে তিনি খুলাফায়ে রাশীদুন-এর একজন অর্থাৎ সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত খলীফা। শিয়াদের মতে আবু বকর(রাঃ) মহানবী (সঃ) আদেশ অমান্য করে খলীফা হয়েছেন। তবে সকল ঐতিহাসিক এবং ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে আবু বকর ইসলামের প্রথম খলীফা হিসেবে চিহ্নিত।

তিনি ৬৩২ থেকে ৬৩৪ সাল পর্যন্ত ইসলামী সাম্রাজ্যের খলীফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইবন সিরিনের মতে মুহাম্মদের পর ইসলামের আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য আবু বকরের কোন বিকল্প ছিল না এবং তিনি তার দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে সমর্থ হন। আয়েশার উদ্ধৃতিমতে আবু বকর এবং উসমান ইসলাম গ্রহণের পূর্বেও কখনও মদ স্পর্শ করেননি। এসকল পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই আবু বকরের দৃঢ়তার পরিচয় পাওয়া যায়।

ইসলামের ১ম খলিফা হযরত আবু বকর (রা:)। তিনি আশারাতুল মুবাশশারার অন্তর্ভুক্ত। হযরত মুহাম্মদ সা. এর প্রিয় সাহাবি ছিলেন।তাছাড়া ইসলামের প্রথম মুসলিম পুরুষ হযরত আবু বকর (র:)।

(৫৭৩-৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দ)। ইসলাম ধর্মের প্রথম খলিফা, হযরত মুহম্মদ (সাঃ)-এর শ্বশু মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ বংশে ৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর বাল্য নাম ছিল আবদুল্লাহ্, আবু বকর ছিল তার ডাক নাম। 

ইসলাম গ্রহণ করিবার পর তিনি সিদ্দীক (সত্যবাদী) এবং আতিক (দানশীল) খেতাব লাভ করেছিলেন। আবু বকরের পিতার নাম ছিল ওসমান, কিন্তু ইতিহাসে তিনি আবু কুহাফা নামেই সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর মাতার নাম উম্মুল খায়ের সালমা। আবু বকরের মাতাপিতা উভয়েই বিখ্যাত কুরাইশ বংশের তায়িম গোত্রের লোক ছিলেন। তার মা প্রথমদিকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং পিতা হিজরীর অষ্টম বৎসরে ইসলামে দীক্ষিত হন।

জন্ম:-অক্টোবর ৫৭৩ মক্কা,আরব দ্বীপ।

মৃত্যু:-২২ আগষ্ট ৬৩৪ মদিনায়।

শাসনকাল :-৮ জুন ৬৩২-২২ আগষ্ট ৬৩৪।

স্ত্রী:- কুতাইলা বিনতে আব্দুল উজ্জা(তালাকপ্রাপ্ত)।

উম্মে রুমান,আসমা বিনতে উমাইস,হাবিবা বিনতে খারিজা।

সন্তান:-*আব্দুল্লাহ ইবনে আবি বকর , আবদুর রহমান ইবনে আবি বকর, মুহাম্মদ ইবনে আবি বকর, আসমা বিনতে আবি বকর, আয়েশা (রা:), উম্মে কুলসুম বিনতে আবি বকর।

পূর্ণ নাম:-আব্দুল্লাহ বিন আবি কুহাফা।আবু বকর নামে পরিচিত।

পিতা ও মাতা:- উসমান আবু কুহাফা ও সালমা উম্মুল খাইর।

ভাইবোন:- *মুতাক, উতাইক, কুহাফা ইবনে উসমান, ফাদরা, কারিবা, উম্মে আমির বংশ:- সিদ্দিকি।

আবু বকরের স্ত্রী কুতাইলা বিনতে আবদুল উজ্জা ইসলাম গ্রহণ করেন নি। আবু বকর তাকে তালাক দিয়েছিলেন। তার অন্য স্ত্রী উম্ম রুমান ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ছেলে আবদুর রহমান ইবনে আবি বকর ছাড়া অন্য সবাই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ফলে আবু বকরের সাথে তার বিচ্ছেদ ঘটে। আবদুর রহমান ইবনে আবি বকর পরবর্তীকালে মুসলিম হয়েছিলেন।

আবু বকরের ইসলাম গ্রহণ অনেককে ইসলাম গ্রহণে অণুপ্রাণিত করেছে। তিনি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের ইসলাম গ্রহণে উৎসাহ যোগান। তার দ্বারা উৎসাহিত হয়ে অনেকে গ্রহণ করেছিলেন।

আবু বকরের অণুপ্রেরণায় ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে রয়েছেন।

হযরত মুহাম্মদ সা. এর মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকার নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। মুহাজির  আনসাররা নিজেদের মধ্য থেকে নেতা নির্বাচনের পক্ষে ছিল। কিছু গোত্র পুরনো প্রথা অণুযায়ী গোত্রভিত্তিক নেতৃত্ব ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চায়। আনসাররা সাকিফা নামক স্থানে একত্রিত হয়ে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করে। এরপর আবু বকর, উমর ও আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ এখানে আসেন। সভার আলোচনায় এক পর্যায়ে উমর ইবনুল খাত্তাব আবু বকরের প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করেন এবং আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহও তার অণুসরণ করেন। এরপর বাকিরাও আবু বকরকে নেতা হিসেবে মেনে নেয়। সুন্নিরা তাকে "খলিফাতুর রাসুল" বা "আল্লাহর রাসুলের উত্তরাধিকারী" বলে সম্মান করে থাকে। তবে শিয়ারা আবু বকরকে বৈধ খলিফা বলে স্বীকার করে না। শিয়া মতাদর্শ অণুযায়ী আলি ইবনে আবি তালিব প্রথম খলিফা হিসেবে যোগ্য।
আবু বকর ছিলেন ইসলামের এক জলন্ত নক্ষত্র ।তাঁর শাসনামলে ইসলাম ও জনগনের জন্য তিনি যুদ্ধও করেছেন। আবু বকরের খিলাফত ২৭ মাস অর্থাৎ দুই বছরের কিছু বেশি সময় স্থায়ী ছিল। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তাকে বেশ কিছু অস্থিতিশীলতার সম্মুখীন হতে হয় এবং তিনি তা সফলভাবে মোকাবেলা করেন। নতুন নবী দাবিকারী বিদ্রোহীদেরকে তিনি রিদ্ধার যুদ্ধে দমন করেছেন। তিনি বাইজেন্টাইন  সাসনীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন যা ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পরে উমর ইবনুুল খাত্তাব ও উসমান ইবনে আফফান এই অভিযান অব্যাহত রেখেছিলেন। এসব অভিযানের ফলে মুসলিম সাম্রাজ্য কয়েক দশকের মধ্যে শক্তিশালী হিসেবে আবির্ভূত হয়। খলিফা হওয়ার পর তিনি অন্যান্যদের পরামর্শক্রমে তার কাপড়ের ব্যবসা ছেড়ে দেন এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ভাতা গ্রহণ করতেন।

হযরত আবু বকর রা. এর জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলীর কিছু ঘটনা:

 ঘটনা ১:

তাবুক অভিযানে তিনি ছিলেন মুসলিম বাহিনীর পতাকাবাহী।এ অভিযানের সময় রাসুলাল্লাহ (সা),র এর আহবানে সাড়া দিয়ে বাড়িতে যা কিছু অর্থ-সম্পদ ছিল সবই তিনি রাসুলাল্লাহ (সা),র হাতে তুলে দেন। আল্লাহর রাসুল জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আবু বকর ছেলে মেয়েদের জন্য বাড়িতে কিছু রেখেছো কি ? জবাবে আবু বকর বললেনঃ তাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই যথেষ্ট।

ঘটনা ২:

শৈশব থেকে আবু বকরের সাথে রাসুলাল্লাহ (সা)র বন্ধুত্য ছিল। তিনি রাসুলাল্লাহ (সা)র অধিকাংশ বাণিজ্য সফরের সফর সঙ্গী ছিলেন। একবার রাসুলাল্লাহ (সা)র সঙ্গে ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়া যান। তখন তাঁর বয়স প্রায় আঠার আর হুজুর (সা) এর বয়স বিশ। তাঁরা যখন সিরিয়া সীমান্তে; বিশ্রামের জন্য রাসুলাল্লাহ (সা)র একটি গাছের নীচে বসেন। আবু বকর একটু সামনে এগিয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগলেন। এক খ্রীষ্টান পাদ্রীর সাথে তাঁর দেখা হয় এবং ধর্ম বিষয়ে কিছু কথা-বার্তা হয়। আলাপের মাঝখানে পাদ্রী জিজ্ঞেস করে ওখানে গাছের নীচে কে ? আবু বকর বললেন, এক কুরাইশ যুবক, নাম মুহাম্মাদ বিন আবদিল্লাহ। পাদ্রী বলে উঠল, এ ব্যক্তি আরবদের নবী হবেন। কথাটি আবু বকরের অন্তরে গেথে যায়। তখন থেকেই তার অন্তরে রাসুলাল্লাহ (সা)র নবী হওয়া সম্পর্কে দৃঢ় প্রত্যয় হতে থাকে। ইতিহাসে এ পাদ্রীর নাম বুহাইরাবানাসতুরাবলে উল্লেখিত হয়েছে।

ঘটনা ৩:

রাসুলাল্লাহ (সা) মুখে মিরাজের কথা অনেকেই যখন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝখানে দোল খাচ্ছিল,তখন তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। হযরত হাসান (রা) বলেনঃ মিরাজের কথা বহু সংখ্যক মুসলমান ইসলাম ত্যাগ করে। লোকে আবু বকরের কাছে গিয়ে বলেঃ আবু ব্কর তোমার বন্ধুকে তুমি বিশ্বাস কর? সে বলেছে, সে নাকি গতরাতে বাইতুল মাকদাসে গিয়েছে, সেখানে সে নামায পড়েছে, অতঃপর মক্কায় ফিরে এসেছে।

আবু বকর বললেনঃ তোমরা কি তাঁকে বিশ্বাস কর? তারা বললঃ হ্যাঁ, ঐতো মসজিদে বসে লোকজনকে এ কথাই বলেছে। আবু বকর বললেনঃ আল্লাহর কসম, তিনি যদি এ কথাই বলে থাকেন তাহলে সত্য কথাই বলেছেন। এতে অবাক হাওয়ার কি দেখলে? তিনি তো আমাকে বলে থাকেন,তাঁর কাছে আল্লাহর কাজ থেকে ওহী আসে। আকাশ থেকে ওহী আসে মাত্র এক মুহূর্তের মধ্যে। তাঁর সে কথাও আমি বিশ্বাস করি। তোমার যে ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছো এটা তাঁর চেয়েও বিস্ময়কর। তারপর তিনি রাসুলাল্লাহ (সা) কাছে গিয়ে হাজির হলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর নবী, আপনি কি জনগনকে বলেছেন যে, আপনি গত রাতে বাইতুল মাকদাস ভ্রমন করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আবু বকর বললেনঃ আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি,আপনি নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূল।রাসুলাল্লাহ (সা) বললেলঃ হে আবু বকর, তুমি সিদ্দিক। এভাবে আবু বকরসিদ্দিকউপাধিতে ভুষিত হন।

এই মহান খলিফা শুধু জীবিত অবস্হায় নয় মৃত্যুর পরেও সকলের চোখের মনি ছিলেন।৬৩৪ সালের ২৩ আগস্ট অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতার মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি বিছানায় শায়িতাবস্থায় থাকেন। আবু বকর তার উত্তরসূরি মনোনীত করার জন্য প্রয়োজনীয়তা অণুভব করেন যাতে তার মৃত্যুর পর মুসলিমদের মধ্যে সমস্যা দেখা না দেয়। অন্যান্য সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করে তিনি উমর ইবনুল খাত্তাবকে তার উত্তরসূরি হিসেবে নিয়োগ দেন।

৬৩৪ সালের ২৩ আগস্ট আবু বকর মারা যান। আয়েশার ঘরে হযরত মুহাম্মদ সা. এ পাশে তাকে দাফন করা হয়। ইসলামের এই প্রথম খলিফা চির স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসের পাতায় রয়েছেন।

 চলবে

লেখক: বহুগ্রন্থ প্রণেতা

ইমাম মাওলানা এম. নুরুর রহমান

সেক্রেটারি:

শারীয়া কাউন্সিল ব্যাডফোরড ও মিডল্যনড ইউ কে- 

ইমাম ও খাতিব:

মাসজিদুল উম্মাহ লুটন ইউ কে

সত্যয়ান কারী চেয়ারম্যন:

নিকাহ নামা সার্টিফিকেট ইউ কে

 প্রিন্সিপাল:

আর রাহমান একাডেমি ইউ কে

পরিচালক:

আর-রাহমান এডুকেশন ট্রাস্ট ইউ কে

📞07476136772 📞 07476 961067

nrahmansky@googlemail.com

Arrahmaneducationtust@gmail.com

https://www.facebook.com/Imam.Nurur

https://www.facebook.com/ARET.OR.UK/

https://www.youtube.com/user/nurur9


শেয়ার করুন

Author:

0 coment rios:

You can comment here