Tuesday, March 2, 2021

সত্যের সন্ধানে, পর্ব ২৩, হযরত ওমর রা.

 

।। ইমাম মাওলানা এম. নুরুর রহমান।।

হযরত ওমর (রা.) বড় হয়েছেন আর দশটা কুরাইশ বালকের মতোই শৈশবে উটের রাখালী করে। তিনি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা এবং প্রধান সাহাবিদের অন্যতম। হযরত আবু বকর (রা.) এর মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে দায়িত্ব নেন। 

হযরত ওমর (রা.) একাধারে ইসলামী আইনের একজন অভিজ্ঞ আইনজ্ঞ, ন্যায় পরায়ন বাদশা। তার এই ন্যায় পক্ষাবলম্বন করার কারণে তাকে আল ফারুক (সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী) উপাধি দেওয়া হয়। তার ক্ষেত্রেই সর্বপ্রথম আমিরুল মুমিনিন উপাধিটি ব্যবহৃত হয়েছে।

বংশ পরিচয়: নাম ওমর, লকব ফারুক এবং কুনিয়াত আবু হাফ্‌স। পিতা খাত্তাব ও মাতা হান্‌তামা। কুরাইশ বংশের আদী গোত্রের লোক। পিতা খাত্তাব কুরাইশ বংশের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। মাতা হানতামাকুরাইশ বংশের বিখ্যাত সেনাপতি হিশাম ইবন মুগীরার কন্যা। ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ এই মুগীরার পৌত্র।

জন্ম ও আকৃতি: রাসূলুল্লাহর সা. জন্মের তের বছর পর তাঁর জন্ম। তাঁর গায়ের রং উজ্জ্বল গৌরবর্ণ, টাক মাথা, গন্ডদেশ মাংসহীন, ঘন দাড়ি, মোঁচের দুপাশ লম্বা ও পুরু এবং শরীর দীর্ঘাকৃতির। হাজার মানুষের মধ্যেও তাঁকেই সবার থেকে লম্বা দেখা যেত।

শিক্ষা: যৌবনের প্রারম্ভেই তিনি তৎকালীন অভিজাত আরবদের অবশ্য-শিক্ষণীয় বিষয়গুলি যথাঃ যুদ্ধবিদ্যা, কুস্তি, বক্তৃতা ও বংশ তালিকা শিক্ষা প্রভৃতি আয়ত্ত করেন। বংশ তালিকা বা নসবনামা বিদ্যা তিনি লাভ করেন উত্তরাধিকার সূত্রে। তাঁর পিতা ও পিতামহ উভয়ে ছিলেন এ বিদ্যায় বিশেষ পারদর্শী। তিনি ছিলেন তাঁর যুগের একজন শ্রেষ্ঠ কুস্তিগীর। আরবের উকাযমেলায় তিনি কুস্তি লড়তেন।

আল্লামা যুবইয়ানী বলেছেনঃ ওমর ছিলেন এক মস্তবড় পাহলোয়ান।তিনি ছিলেন জাহিলী আরবের এক বিখ্যাত ঘোড় সওয়ার। আল্লামা জাহিয বলেছেনঃ ওমর ঘোড়ায় চড়লে মনে হত, ঘোড়ার চামড়ার সাথে তাঁর শরীর মিশে গেছে।’ [আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন]

কাব্য প্রতিভা: তাঁর মধ্যে কাব্য প্রতিভাও ছিল। তৎকালীন খ্যাতনামা কবিদের প্রায় সব কবিতাই তাঁর মুখস্থ ছিল। আরবী কাব্য সমালোচনার বিজ্ঞান ভিত্তিক ধারার প্রতিষ্ঠাতা প্রকৃতপক্ষে তিনিই। ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর মতামতগুলি পাঠ করলে এ বিষয়ে তাঁর যে কতখানি দখল ছিল তা উপলব্ধি করা যায়। বাগ্মিতা ছিল তাঁর সহজাত গুণ। যৌবনে তিনি কিছু লেখাপড়া শিখেছিলেন। বালাজুরী লিখেছেনঃ রাসূলে কারীমের সা. নবুওয়াত প্রাপ্তির সময় গোটা কুরাইশ বংশে মাত্র সতের জন লেখা-পড়া জানতেন। তাদের মধ্যে উমার একজন।

ইসলাম গ্রহণ: ইমাম যুহরী বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহ সা. দারুল আরকামে প্রবেশের পর ওমর রা. ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পূর্বে নারী-পুরুষ সর্বমোট ৪০ অথবা চল্লিশের কিছু বেশী লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। উমারের ইসলাম গ্রহণের পর জিবরীল আ. এসে বলেনঃ ‘‘মুহাম্মাদ, ’উমারের ইসলাম গ্রহণে আসমানের অধিবাসীরা উৎফুল্ল হয়েছে।’ [তাবাকাতঃ ৩/২৬৯]

উমারের ইসলাম গ্রহণে ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। যদিও তখন পর্যন্ত ৪০/৫০ জন লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং তাদের মধ্যে হযরত হামযাও ছিলেন, তথাপি মুসলমানদের পক্ষে কাবায় গিয়ে নামায পড়া তো দূরের কথা নিজেদেরকে মুসলমান বলে প্রকাশ করাও নিরাপদ ছিল না। হযরত উমারের ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথে এ অবস্থার পরিবর্তন হলো। তিনি প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দিলেন এবং অন্যদের সংগে নিয়ে কাবা ঘরে নামায আদায় শুরু করলেন।

রাসুল কর্তৃক উপাধি লাভ: রাসূল সা. ওমর রা: কে আল-ফারুকউপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। কারণ, তাঁরই কারণে ইসলাম ও কুফরের মধ্যে প্রকাশ্য বিভেদ সৃষ্টি হয়েছিল।

কর্মময় জীবন: হিজরী প্রথম বছর হতে রাসূলে কারীমের সা. ওফাত পর্যন্ত হযরত ওমরের রা. কর্মজীবন প্রকৃতপক্ষে হযরত রাসূলে কারীমের সা. কর্মময় জীবনেরই একটা অংশবিশেষ। রাসূলকে সা. যত যুদ্ধ করতে হয়েছিল, যত চুক্তি করতে হয়েছিল, কিংবা সময় সময় যত বিধিবিধান প্রবর্তন করতে হয়েছিল এবং ইসলাম প্রচারের জন্য যত পন্থা অবলম্বন করতে হয়েছিল তার এমন একটি ঘটনাও নেই, যা উমারের সক্রিয় অংশগ্রহণ ব্যতীত সম্পাদিত হয়েছে। এইজন্য এসব ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ লিখতে গেলে তা উমারের রা. জীবনী না হয়ে হযরত রাসূল কারীমের সা. জীবনীতে পরিণত হয়। তাঁর কর্মবহুল জীবন ছিল রাসূল কারীমের সা. জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।

মক্কা বিজয়ের সময় হযরত ওমর রা. ছায়ার মত রাসূলকে সা. সঙ্গ দেন। ইসলামের মহাশত্রু আবু সুফিয়ান আত্মসমর্পণ করতে এলে উমার রাসূলুল্লাহকে সা. অনুরোধ করেনঃ অনুমতি দিন এখনই ওর দফা শেষ করে দিই।এদিন মক্কার পুরুষরা রাসূলুল্লাহর সা. হাতে এবং মহিলারা রাসূলুল্লাহর সা. নির্দেশে উমারের নিকট বাইয়াত গ্রহণ করছিলেন।

নবীর ওফাতের পরের অবস্থা: রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের খবর শুনে হযরত উমার কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকেন। তারপর মসজিদে নববীর সামনে যেয়ে তরবারি কোষমুক্ত করে ঘোষণা করেন, ‘যে বলবে রাসূলুল্লাহ সা. ইনতিকাল করেছেন, আমি তার মাথা দ্বিখণ্ডিত করে ফেলবো।এ ঘটনা থেকে রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি তাঁর ভক্তি ও ভালোবাসার পরিমাণ সহজেই অনুমান করা যায়।

রাসূলুল্লাহর সা. ইনতিকালের পর সাকীফা বনী সায়েদায়দীর্ঘ আলোচনার পর উমার খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে হযরত আবু বকরের হাতে খিলাফতের বাইয়াত গ্রহণ করেন। ফলে খলীফা নির্বাচনের মহা সংকট সহজেই কেটে যায়।

হযরত ওমরের রাষ্ট্র শাসন পদ্ধতি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা সম্ভব নয়। দশ বছরের স্বল্প সময়ে গোটা বাইজান্টাইন রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটান। তাঁর যুগে বিভিন্ন অঞ্চলসহ মোট ১০৩৬ টি শহর বিজিত হয়। ইসলামী হুকুমাতের নিয়মতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠা মূলতঃ তাঁর যুগেই হয়। সরকার বা রাষ্ট্রের সকল শাখা তাঁর যুগেই আত্মপ্রকাশ করে। তাঁর শাসন ও ইনসাফের কথা সারা বিশ্বের মানুষের কাছে কিংবদন্তীর মত ছড়িয়ে আছে।

আমীরুল মুমিনীন উপাধি লাভ: হযরত উমার প্রথম খলীফা যিনি আমীরুল মুমিনীনউপাধি লাভ করেন। তিনিই সর্বপ্রথম হিজরী সন প্রবর্তন করেন, তারাবীর নামায জামাআতে পড়ার ব্যবস্থা করেন, জন শাসনের জন্য দুর্রা বা ছড়ি ব্যবহার করেন, মদপানে আশিটি বেত্রাঘাত নির্ধারণ করেন, বহু রাজ্য জয় করেন, নগর পত্তন করেন, সেনাবাহিনীর স্তরভেদ ও বিভিন্ন ব্যাটালিয়ান নির্দিষ্ট করেন, জাতীয় রেজিষ্টার বা নাগরিক তালিকা তৈরী করেন, কাযী নিয়োগ করেন এবং রাষ্ট্রকে বিভিন্ন প্রদেশে বিভক্ত করেন।

নবী সা. এর সাথে কন্যার বিবাহ: উমার রা. ছিলেন রাসূলুল্লাহর অন্যতম কাতিব। নিজ কন্যা হযরত হাফসাকে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে বিয়ে দেন।

প্রথম খলিফার উপদেষ্টা: হযরত ওমর রা. প্রথম খলিফা হযরত আবু বকরের রা. মন্ত্রী উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেন।

ব্যবসায়ী ওমর রা.: ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ও পরে ব্যবসা ছিল তাঁর জীবিকার উপায়। খিলাফতের গুরুদায়িত্ব কাঁধে পড়ার পরও কয়েক বছর পর্যন্ত ব্যবসা চালিয়ে যান। কিন্তু পরে তা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালে হযরত আলী রা. সহ উঁচু পর্যায়ের সাহাবীরা পরামর্শ করে বাইতুল মাল থেকে বাৎসরিক মাত্র আট শদিরহাম ভাতা নির্ধারণ করেন। হিজরী ১৫ সনে বাইতুল মাল থেকে অন্য লোকদের ভাতা নির্ধারিত হলে বিশিষ্ট সাহাবীদের ভাতার সমান তাঁরও ভাতা ধার্য করা হয় পাঁচ হাজার দিরহাম।

জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা: জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা ও প্রসারের ক্ষেত্রে উমারের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। তিনি আরবী কবিতা পঠন-পাঠন ও সংরক্ষণের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। আরবী ভাষার বিশুদ্ধতা রক্ষার প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত সজাগ; তাঁর সামনে ভাষার ব্যাপারে কেউ ভুল করলে শাসিয়ে দিতেন। বিশুদ্ধভাবে আরবী ভাষা শিক্ষা করাকে তিনি দ্বীনের অঙ্গ বলে বিশ্বাস করতেন।

মৃত্যু: প্রখ্যাত সাহাবী মুগীরা ইবন শুবার রা. অগ্নি উপাসক দাস আবু লুলু ফিরোজ ফজরের নামাযে দাঁড়ানো অবস্থায় এই মহান খলীফাকে ছুরিকাঘাত করে। আহত হওয়ার তৃতীয় দিনে হিজরী ২৩ সনের ২৭ জিলহজ্জ বুধবার তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল নবীজীর সমান ৬৩ বছর। তাঁর খিলাফতকাল দশ বছর ছয় মাস চার দিন। হযরত সুহায়িব রা. জানাযার নামায পড়ান। রওজায়ে নববীর মধ্যে হযরত সিদ্দীকে আকবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।

শেষ অসিয়ত: মৃত্যুর পূর্বে আলী, উসমান, আবদুর রহমান ইবন আউফ, সা, যুবাইর ও তালহা রা. এ ছয়জন বিশিষ্ট সাহাবীর ওপর তাদের মধ্য থেকে কোন একজনকে খলীফা নির্বাচনের দায়িত্ব অর্পণ করে যান।

হযরত ওমর (রা.) এর জীবনের অসংখ্য অবদানের কিছু অবদান সংক্ষেপে তুলে ধরা হল:

১. হযরত ওমর (রা.) ছিলেন তৎকালীন আরবের গুটিকয়েক শিক্ষিত লোকদের মধ্যে অন্যতম। সমগ্র আরবে স্বল্প যে কয়জন লোক অক্ষরজ্ঞানের অধিকারী ছিল, হযরত ওমর (রা.) ছিলেন তাদের মধ্যে একজন। 

২. যৌবনে হযরত ওমর (রা.) কুস্তিগীর, মল্লযোদ্ধা এবং বক্তা হিসেবে খ্যাত ছিলেন। 

৩. হযরত ওমর (রা.) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ইসলাম প্রচারের প্রচন্ড বিরোধী ছিলেন। ইসলাম প্রচারের  বিরোধীতা করতে গিয়ে তিনি এতদূর অগ্রসর হন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে হত্যার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। 

৪. হযরত ওমর (রা.) এর ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তার ভাই হযরত যায়েদ ইবনে খাত্তাব (রা.), বোন হযরত ফাতেমা ইবনে খাত্তাব (রা.) এবং ভগ্নিপতি হযরত সাঈদ ইবনে যায়েদ (রা.) তার পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। 

৫. রাসূল (সা.) কে হত্যা করতে গিয়ে তিনি তার বোন ও ভগ্নিপতির ইসলাম গ্রহণের খবর পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে বোনের বাড়ীতে যান। পরে ঘটনাক্রমে সেখানে তিনি সূরা ত্বাহার প্রথম ছয় আয়াত পাঠ করার সুযোগ পান। সূরা ত্বাহার এই ছয় আয়াত পাঠ করার পর তিনি ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন এবং রাসূল (সা.) এর কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন।  

৬. হযরত ওমর (রা.) এর উৎসাহেই রাসূল (সা.) কাবার চত্ত্বরে মুসলমানদের নিয়ে জাময়াতে নামায আদায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং এর মাধ্যমে মুসলমানরা প্রথমবারের মত মক্কায় প্রকাশ্যে নামায আদায় করে। 

৭. রাসূল (সা.) প্রথম তাকে আল-ফারুক (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী) নামে ভূষিত করেন। 

৮. নামাযের জন্য আযান দেওয়ার ব্যবস্থা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.) এবং হযরত ওমর (রা.) এর স্বপ্নের ভিত্তিতেই গ্রহণ করা হয়। 

৯. রাসূল (সা.) এর ইন্তেকালের পর খলীফা হিসেবে হযরত আবু বকর (রা.) এর নাম প্রথম হযরত ওমর (রা.) উত্থাপন করেন এবং তিনিই প্রথম আবু বকর (রা.) এর কাছে বাইয়াত করেন। 

১০. হযরত আবু বকর (রা.) হযরত ওমর (রা.) এর পরামর্শেই প্রথম কুরআন সংকলনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং এই লক্ষ্যে হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) এর নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেন। 

১১. হযরত আবু বকর (রা.) তার ইন্তেকালের সময় হযরত ওমর (রা.) কে খলীফা হিসেবে নিযুক্তির জন্য মুসলিম জনসাধারণের কাছে সুপারিশ করে যান এবং এই সুপারিশের ভিত্তিতেই হযরত ওমর (রা.) খলীফা হিসেবে নির্বাচিত হন। 

১২. হযরত ওমর (রা.) প্রথম খলীফা যিনি আমীরুল মুমিনিন (বিশ্বাসীদের নেতা) উপাধিতে ভূষিত হন। 

১৩. হযরত ওমর (রা.) এর শাসনকালেই তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তি; পারসিক সাসানীয় সাম্রাজ্য এবং রোমান বাইজান্টানীয় সাম্রাজ্যকে মুসলমানরা চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে সমগ্র পারস্য সাম্রাজ্যে এবং বাইজান্টানিয় শাসনাধীন এশীয় ও আফ্রিকান অঞ্চলসমূহে মুসলিম শাসনের বিস্তার করে। 

১৪. ৬৩৭ ঈসায়ীতে হযরত ওমর (রা.) জেরুসালেম সফর করেন এবং রোমানদের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত অসংখ্য নবীর স্মৃতিধন্য বাইতুল মুকাদ্দাস তথা মসজিদুল আকসাকে পুননির্মাণ করেন। 

১৫. মুসলিম খিলাফতের সচিবালয়, বাইতুল মাল (কোষাগার), সেনানিবাস, প্রাদেশিক শাসন ও বিচারব্যবস্থা ওমর (রা.) প্রথম প্রবর্তন করেন। এছাড়া মুসলিম মুদ্রা ব্যবস্থা এবং হিজরী ক্যালেন্ডারের প্রবর্তন তার হাত ধরেই সম্পন্ন হয়।  

১৬. হযরত ওমর (রা.) প্রথম মুসলিম শাসক যিনি দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেন।

ফিলিস্তিনের আল কুদস ও রামলার মধ্যভাগে অবস্থিত একটি অঞ্চল হলো আমওয়াস বা ইমওয়াস। সেখানে প্লেগ রোগ প্রথম প্রকাশ পায়। অতঃপর তা শামে ছড়িয়ে পড়ে। ইসলামের ইতিহাসে তা তাউন ইমওয়াসনামে পরিচিত। ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল ইমওয়াস অঞ্চল পুরোপুরি ধ্বংস করে ওই স্থানে কানাডাভিত্তিক ইহুদি তহবিলের অর্থায়নে একটি পার্ক তৈরি করা হয়। বর্তমানে তা কানাডা পার্কনামে সবার কাছে পরিচিত।

১৭ হিজরি ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে ওমর (রা.) দ্বিতীয়বারের মতো শাম পরিদর্শনের জন্য বের হন। ওমর (রা.) শামে পৌঁছার পর শুনতে পান যে সেখানে প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। তা ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করছে।

আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত, উমর বিন খাত্তাব (রা.) শামের উদ্দেশে বের হন। শামে অবস্থিত তাবুক গ্রামের সারগনামক এলাকার কাছে এলে সেনাপতি আবু উবাদাহ ও অন্য নেতাদের সঙ্গে দেখা হয়। ওমর (রা.)-কে তাঁরা অবহিত করল যে শামে মহামারি ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁদের কথা শুনে ওমর (রা.) আমাকে বলেন, ‘ইসলামের প্রথম পর্যায়ের মুহাজিরদের ডাক দাও।তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিল। কেউ বললেন, আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন। তা না করে ফিরে যাওয়া আমরা সমীচীন মনে করছি না। অনেকে বলল, আপনার সঙ্গে অনেক মানুষ ও রাসুল (সা.)-এর মহান সাহাবিরা আছেন। এমতাবস্থায় তাঁদের নিয়ে আপনি মহামারি আক্রান্ত এলাকায় যাবেন না।

সবার কথা শুনে ওমর (রা.) বলেন, ‘তোমরা চলে যাও।অতঃপর ওমর (রা.) আমাকে বললেন, ‘আনসারদের আমার কাছে ডেকে আনো।তাঁদের ডেকে পরামর্শ করলেন। তাঁরাও মুহাজিরদের মতো মতবিরোধ করল। তিনি বলেন, ‘তোমরা চলে যাও।অতঃপর আমাকে বলেন, ‘এখানে কুরাইশ বংশের প্রবীণ মুহাজির সাহাবিদের ডাক দাও।আমি তাদের ডেকে আনি। তাঁদের মধ্যে দুজনও মতবিরোধ করল না। সবাই অভিন্ন কথা ব্যক্ত করে বলল, আমরা মনে করছি, আপনি সব মানুষকে নিয়ে ফিরে যাবেন। মানুষকে এই মহামারিতে নেবেন না।

অতঃপর ওমর (রা.) সবাইকে সামনে নিয়ে ঘোষণা দিলেন, ‘আমি চলে যাব। তোমরাও চলে যাও।’ [তখন শামের গভর্নর ছিলেন আবু উবাদায় বিন জাররাহ (রা.)] এ কথা শুনে আবু উবাদাহ (রা.) বললেন, ‘আপনি আল্লাহর তাকদির থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন?’ ওমর (রা.) বলেন, ‘আহ, হে আবু উবাদাহ, এমন কথা তুমি ছাড়া অন্য কেউ বলত!মূলত ওমর (রা.) তাঁর মতভিন্নতাকে অপছন্দ করেছেন।

ওমর (রা.) আবু উবায়দার প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা আল্লাহর এক তাকদির থেকে অন্য তাকদিরের দিকে পালিয়ে যাচ্ছি। যেমন মনে করো, তোমার অনেক উট আছে। তা নিয়ে তুমি এক উপত্যকায় এসেছ। উপত্যকার দুটি প্রান্ত আছে। এক প্রান্ত উর্বর। আরেক প্রান্ত শুষ্ক। তুমি উর্বর প্রান্তে উট চরালে কি আল্লাহর তাকদিরের ওপর নির্ভর করবে না? এবং শুষ্ক প্রান্তে  চরালেও কি আল্লাহর তাকদিরের ওপর নির্ভর করবে না?’

কিছুক্ষণ পর আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.) এলেন। কোনো এক প্রয়োজনে তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, এ বিষয় সম্পর্কে আমার জ্ঞান আছে। আমি রাসুল (সা.)-এর কাছে শুনেছি, ‘তোমরা কোনো অঞ্চলে প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাবের কথা শুনলে তাতে প্রবেশ করবে না। তবে সেখানে থাকাবস্থায় প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়লে তোমরা সেখান থেকে বের হবে না।এ কথা শুনে ওমর (রা.) আলহামদুলিল্লাহ বললেন। অতঃপর সবাই ফিরে গেলেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৭২৯)

ওমর (রা.) মহামারি চরম আকার ধারণের খবর অবগত হন। ওমর (রা.) চাইলেন সেনাপতি আবু উবায়দা (রা.)-কে ফিরিয়ে আনতে। তাই ওমর (রা.) একটি চিঠি লিখলেন, ‘তোমার ওপর শান্তি বর্ষণ হোক। তোমার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এ সম্পর্কে সরাসরি তোমাকে বলতে চাই। তাই তোমাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বলছি, আমার পত্র পড়ে আমার উদ্দেশে বের হওয়ার আগে পত্রটি তোমার হাতছাড়া করবে না। রাতে পত্র পৌঁছলে সকাল হওয়ার আগেই যাত্রা শুরু করবে। আর দিনের বেলায় পৌঁছলে সন্ধ্যা হওয়ার আগেই যাত্রা শুরু করবে।আবু উবায়দা (রা.) পত্র পড়ে উদ্দেশ্য বুঝে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ আমিরুল মুমিনিনকে ক্ষমা করুন।অতঃপর ওমর (রা.)-এর উদ্দেশে একটি পত্র লিখলেন, ‘হে আমিরুল মুমিনিন, আমি আপনার প্রয়োজনের বিষয় বুঝেছি। আমি এখন মুসলিম সেনাবাহিনীতে অবস্থান করছি। তাদের ছেড়ে যেতে চাই না। আল্লাহ তাআলা আমিসহ সবার ব্যাপারে ফায়সালা করবেন। অতএব হে আমিরুল মুমিনিন, আপনার সিদ্ধান্ত থেকে আমাকে মুক্ত করুন। আমার সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে আমাকে ছেড়ে দিন।

আবু উবায়দা (রা.)-এর পত্র পড়ে ওমর (রা.) কাঁদতে থাকেন। আশপাশের মুসলিমরা ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘হে আমিরুল মুমিনিন, আবু উবায়দা কি শহীদ হয়েছেন? ওমর (রা.) বলেন, ‘না, তিনি এখনো শহীদ হননি। কিন্তু ...।অর্থাৎ শিগগির তিনি শহীদ হবেন।’  এর পরই আবু উবায়দা (রা.) প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৭/৪৪)

হযরত ওমর রা: বিচার      

একবার হযরত ওমর (রা) জনৈক বেদুইনের কাছ থেকে একটি ঘোড়া কিনলেন। ঘোড়ার দাম পরিশোধ করেই তিনি ঘোড়ায় চড়লেন এবং তাকে হাঁকিয়ে নিয়ে গেলেন। কিছুদূর যেতেই ঘোড়াটি হোঁচট খেয়ে খোঁড়া হয়ে গেল। তিনি তৎক্ষণাৎ ঘোড়াকে পিছনের দিকে ফিরিয়ে ঐ বেদুইনের কাছে নিয়ে গেলেন। হযরত ওমর ভেবেছিলেন ঘোড়াটির আগে থেকেই পায়ে কোনো খুঁত ছিল, যা সামান্য ধাক্কা খেয়ে ভেঙ্গে গেছে। তিনি ঘোড়ার মালিককে বললেন, “তোমার ঘোড়া ফেরত নাও। এর পা ভাঙ্গা।

সে বললোঃ আমিরুল মুমিনীন! আমি ফেরত নিতে পারবো না। কারণ আমি যখন বিক্রী করেছি, তখন ঘোড়াটি ভাল ছিল।

হযরত ওমর বললেনঃ ঠিক আছে। একজন সালিশ মানা হোক। সে আমাদের বিরোধ মিটিয়ে দিবে।

লোকটি বললোঃ শুরাইহ বিন হারিস কান্দী নামে একজন ভালো জ্ঞানী লোককে আমি চিনি। তাকেই শালিশ মানা হোক। হযরত ওমর রাজী হলেন। উভয়ে শুরাইহের খলিফাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ আমিরুল মুমিনীন! আপনি কি ঘোড়াটি সুস্থ অবস্থায় কিনেছিলেন?”

হযরত ওমর বললেন, হ্যাঁ।

শুরাইহ বললেন, তাহলে হয় আপনি ঘোড়াটি মূল্য দিয়ে কিনে নিন। নচেত যে অবস্থায় কিনেছিলেন সে অবস্থায় ফেরত দিন।

এ কথা শুনে খলিফা ওমর(রা) চমৎকৃত হয়ে বললেনঃ এটাই সঠিক বিচার বটে। তুমি সম্পূর্ণ নির্ভূল মত ও ন্যায্য রায় দিয়েছ। তুমি কুফা চলে যাও। আজ থেকে তুমি কুফার বিচারপতি।

সেই থেকে দীর্ঘ ষাট বছর যাবত পর্যন্ত তিনি মুসলিম জাহানের বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন। যতদূর জানা যায়, হযরত আলীর সময়ে তিনি খলিফার বিরুদ্ধে অনুরূপ আর একটি রায় দিয়ে প্রধান বিচারপতির পদে উন্নীত হন। তারপর উমাইয়া শাসনকালে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের অবর্ণনীয় অত্যাচারে বিরক্ত হয়ে তিনি পদত্যাগ না করা পর্যন্ত কোনো শাসকই তাকে পদচ্যূত করার সাহস পান নি।

হযরত আলী(রা) একবার তাঁর অতিপ্রিয় বর্ম হারিয়ে ফেললেন। কিছুদিন পর জনৈক ইহুদীর হাতে সেটি দেখেই চিনে ফেললেন। লোকটি কুফার বাজারে সেটি বিক্রয় করতে এনেছিল। হযরত আলী তাকে বললেনঃ এতো আমার বর্ম। আমার একটি উটের পিঠ থেকে এটি অমুক রাত্রে অমুক জায়গায় পড়ে গিয়েছিল।

ইহুদী বললোঃ আমীরুল মুমিনীন! ওটা আমার বর্ম এবং আমার দখলেই রয়েছে।

হযরত আলী পুনরায় বললেনঃ এটি আমারই বর্ম। আমি এটাকে কাউকে দানও করি নি, কারো কাছে বিক্রয়ও করি নি। এটি তোমার হাতে কিভাবে গেল?”

ইহুদী বললোঃ চলুন, কাযীর দরবারে যাওয়া যাক।

হযরত আলী(রা) বললেনঃ বেশ, তাই হোক। চলো।তারা উভয়ে গেলেন বিচারপতি শুরাইহের দরবারে। বিচারপতি শুরাইহ উভয়ের বক্তব্য জানতে চাইলে উভয়ে বর্মটি নিজের বলে যথারীতি দাবী জানালেন।

বিচারপতি খলিফাকে সম্বোধন করে বললেনঃ আমিরুল মুমিনীন! আপনাকে দুজন সাক্ষী উপস্থিত করতে হবে। হযরত আলী বললেনঃ আমার ভৃত্য কিম্বার এবং ছেলে হাসান সাক্ষী আছে।

শুরাইহ বললেনঃ আপনার ভৃত্যের সাক্ষ্য নিতে পারি। কিন্তু ছেলের সাক্ষ্য নিতে পারবো না। কেননা বাপের জন্য ছেলের সাক্ষ্য শরীয়তের আইনে অচল।

হযরত আলী বললেনঃ বলেন কি আপনি? একজন বেহেশতবাসীর সাক্ষ্য চলবে না? আপনি কি শোনেন নি, রাসূল(সা) বলেছেন, হাসান ও হোসেন বেহেশতের যুবকদের নেতা?”

শুরাইহ বললেনঃ শুনেছি আমিরুল মুমিনীন! তবু আমি বাপের জন্য ছেলের সাক্ষ্য গ্রহণ করবো না।অনন্যোপায় হযরত আলী ইহুদীকে বললেনঃ ঠিক আছে। বর্মটা তুমিই নিয়ে নাও। আমার কাছে এই দুজন ছাড়া আর কোনো সাক্ষী নেই।

ইহুদী তৎক্ষণাৎ বললোঃ আমিরুল মুমিনীন! আমি স্বয়ং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, ওটা আপনারই বর্ম। কি আশ্চর্য! মুসলমানদের খলিফা আমাকে কাজীর দরবারে হাজির করে আর সেই কাযী খলিফার বিরুদ্ধে রায় দেয়। এমন সত্য ও ন্যায়ের ব্যবস্থা যে ধর্মে রয়েছে আমি সেই ইসলামকে গ্রহণ করেছি। আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু………..

অতঃপর বিচারপতি শুরাইহকে সে জানালো যে, “খলিফা সিফফীন যুদ্ধে যাওয়ার সময় আমি তাঁর পিছু পিছু যাচ্ছিলাম। হঠাৎ তাঁর উটের পিঠ থেকে এই বর্মটি পড়ে গেলে আমি তা তুলে নিই।

হযরত আলী(রা) বলেনঃ বেশ! তুমি যখন ইসলাম গ্রহণ করেছ, তখন আমি ওটা তোমাকে উপহার দিলাম।

এই লোকটি পরবর্তীকালে নাহরাওয়ানে হযরত আলীর নেতৃত্বে খারেজীদের সাথে যুদ্ধ করার সময় শহীদ হন।

আর একবার কাযী শুরাইহের ছেলে জনৈক আসামীর জামিন হয়। আসামী জামিনে মুক্তি পেয়ে পালিয়ে গেলে শুরাইহ আসামীর বিনিময়ে ছেলেকে জেলে আটকান। যতদিন আসামীকে খুঁজে পাওয়া যায় নি ততদিন সে জেলে আটক এবং কাযী সাহেব স্বয়ং বন্দী ছেলের জন্য জেলখানায় খাবার দিয়ে আসতেন।

কাযী শুরাইহের আর এক ছেলে একবার এক গোত্রের সাথে জমিজমা সংক্রান্ত মোকদ্দমার সম্মুখীন হন। মোকদ্দমাটি শুরাইহের আদালতেই আসার কথা ছিল। তাই পিতার সাথে আগেভাগেই পরামর্শ করার জন্য ছেলেটি একদিন বললোঃ আব্বা, আপনি আমার মামলার বিবরণটি পুরোপুরি শুনে আমাকে বলুন আমার জেতার সম্ভাবনা আছে কি না। যদি থাকে তাহলে আমি মামলাটি রুজু করবো। নচেত বিরত থাকবো। বিচারপতি শুরাইহ পুরো ঘটনা শুনে ছেলেকে মামলা রুজু করার পরামর্শ দিলেন।

যথাসময়ে মামলার শুনানি শুরু হলো। শুনানী শেষে শুরাইহ নিজের ছেলের বিরুদ্ধে রায় দিলেন।

রাত্রে বাসায় এসে ছেলে পিতার কাছে অনুযোগের সুরে বললোঃ আব্বা, আপনি আমাকে এভাবে অপমান করলেন! আমি যদি আগেভাগে আপনার পরামর্শ না নিতাম, তা হলেও একটা সান্তনা ছিল। কিন্তু…..

কাযী শুরাইহ বললেনঃ হে বৎস! তুমি আমার কাছে পৃথিবীর সবার কাছ হতে প্রিয়; কিন্তু তোমার কাছ হতেও আল্লাহ আমার কাছে অনেক বেশী প্রিয়। আমি জানতাম, তোমার বিপক্ষের দাবীই সঠিক ও ন্যায়সংগত। কিন্তু তোমাকে সেটা জানিয়ে দিলে তুমি তাদের সাথে এমনভাবে আপোষ করে নিতে পারতে, যার ফলে তাদের প্রাপ্য অংশ বিশেষ তোমাকে দিতে হতো। তেমনটি ঘটলে আল্লাহ আমার উপর নারাজ হতেন। এজন্যই আমি তোমাকে মামলা আদালতে আনবার পরামর্শ দিয়েছিলাম। এখন তোমার খুশি হওয়া উচিত যে, তুমি অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পত্তি দখল করা থেকে রক্ষা পেলে।

বর্ণিত আছে যে, বিচারপতি শুরাইহ যখন কোনো মামলার শুনানী গ্রহণ করতেন, তখন সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদেরকে সাক্ষ্য দেওয়ার ভয়াবহ পরিণাম স্মরণ করিয়ে দিতেন এবং বলতেন, “তোমাদের সাক্ষ্যের ওপরই এই মামলার রায় নির্ভরশীল। এখনো সময় আছে, তোমরা ইচ্ছা করলে সাক্ষ্য না দিয়েও চলে যেতে পারো।

এরপরও যখন সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে চাইতো, তিনি সাক্ষ্য নিতেন এবং রায় দেয়ার সময় বিজয়ী পক্ষকে হুশিয়ার করে দিতেন যে, “শুধুমাত্র সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই আমি এই রায় দিলাম। আল্লাহ যা হারাম করেছেন, এই রায়ের দ্বারা তা হালাল হবে না।

সম্ভবতঃ এসব দুর্লভ গুণ বৈশিষ্ট্যের কারণেই হাজার হাজার জ্ঞানীগুণী সাহাবী বেঁচে থাকা সত্ত্বেও হযরত ওমরের আমল থেকে শুরু করে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের শাসনামল পর্যন্ত দীর্ঘ ৬০ বছরব্যাপী কাযী শুরাইহ মুসলিম জাহানের প্রধান বিচারপতির পদে বহাল আছে।

আলোচনার প্রান্তটিকায় এসে বলতে পারি যে, হযরত ওমর (রা.) শাসনামলে খিলাফতের সীমানা অকল্পনীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। সাসানীয় সাম্রাজ্য ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের দুই তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণে আসে মুসলিমদের হাতে। তার শাসনামলে জেরুজালেম মুসলিমদের হস্তগত হয়। তিনি পূর্বের খ্রিষ্টান রীতি বদলে ইহুদিদেরকে জেরুজালেমে বসবাস ও উপাসনা করার সুযোগ দিয়েছিলেন। তিনি ইসলামী সাম্রাজ্যকে পূর্বে পারস্য থেকে পশ্চিমে বর্তমান তিউনিসিয়া, দক্ষিণে ইয়েমেন থেকে উত্তরে ককেশাস পর্বত পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। ঈসায়ী ৬৪৪ সালের ৩রা নভেম্বর, ২৩ হিজরীর ২৬শে জিলহজ্জ্ব জনৈক পারসিক কৃতদাসের হাতে শহীদ হন। 

তিনি ইসলাম গ্রহণের পর রাসূল (সা.) এর অন্যতম প্রধান সহকারী হিসেবে পরিনত হন। তার ইসলাম গ্রহণের পর পরই মুসলমানরা প্রথম প্রকাশ্যে কাবায় নামায আদায় করার সাহস করে। তিনি ছিলেন রাসূল (সঃ) এর শ্বশুর। অর্থাৎ ওমর (রাঃ) এর মেয়ে হাফসা (রাঃ) ছিলেন রাসূল (সঃ) এর স্ত্রী।

লেখক: বহুগ্রন্থ প্রণেতা

ইমাম মাওলানা এম. নুরুর রহমান

সেক্রেটারি:

শারীয়া কাউন্সিল ব্যাডফোরড ও মিডল্যনড ইউ কে- 

ইমাম ও খাতিব:

মাসজিদুল উম্মাহ লুটন ইউ কে

সত্যয়ান কারী চেয়ারম্যন:

নিকাহ নামা সার্টিফিকেট ইউ কে

 প্রিন্সিপাল:

আর রাহমান একাডেমি ইউ কে

পরিচালক:

আর-রাহমান এডুকেশন ট্রাস্ট ইউ কে

📞07476136772 📞 07476 961067

nrahmansky@googlemail.com

Arrahmaneducationtust@gmail.com

https://www.facebook.com/Imam.Nurur

https://www.facebook.com/ARET.OR.UK/

https://www.youtube.com/user/nurur9

 



শেয়ার করুন

Author:

0 coment rios:

You can comment here